ইউটিউব দেখে পেঁপে চাষে সাফল্য, কামালের মাসে আয় ৪৫ হাজার
সবুজ পাতার আড়ালে সারি সারি কাঁচা-পাকা পেঁপে। কুয়াকাটা-মিশ্রীপাড়া সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় বাগানটি নজর কাড়ে পর্যটকদের। কেউ বাগান দেখতে গাড়ি থামান, কেউ আবার গাছ থেকে পেড়ে নেওয়া টাটকা পেঁপে কিনে নিয়ে যান বাড়ির জন্য। অথচ মাত্র দুই বছর আগেও এখানে এমন কোনো বাগান ছিল না।
কুয়াকাটার লতাচাপলী ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের কৃষক মো. কামাল হোসেন ইউটিউবে পেঁপে চাষের ভিডিও দেখে প্রায় দুই বছর আগে বাড়ির আঙিনায় মাত্র ৩০টি গাছ দিয়ে চাষ শুরু করেন। শখের বশে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন রূপ নিয়েছে ১৫০টির বেশি গাছের বাগানে। পেঁপে বিক্রি করে প্রতি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি।
৬০ বছর বয়সী কামাল হোসেন বলেন, শুরুতে পেঁপে চাষকে ব্যবসা হিসেবে নেননি। বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা জায়গা কাজে লাগাতেই কয়েকটি গাছ লাগিয়েছিলেন। গাছগুলো ভালোভাবে বেড়ে ফলন দেওয়ার পর তার আগ্রহ বাড়ে। এরপর ধীরে ধীরে বাগানে গাছের সংখ্যা বাড়াতে থাকেন।
কামাল হোসেন বলেন, ‘প্রথমে ৩০টি গাছ লাগিয়েছিলাম শখের বশে। তখন ভাবিনি, এই গাছ থেকেই একদিন সংসারের বড় একটি আয়ের উৎস হবে। গাছগুলো ভালো হওয়ার পর বুঝলাম, আমাদের এলাকার লবণাক্ত মাটিতেও পেঁপে ভালো হতে পারে। এরপর আস্তে আস্তে গাছ বাড়িয়েছি।’
তিনি বলেন, বর্তমানে বাগানে ১৫০টির বেশি গাছ রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পর্যটকসহ স্থানীয় বাজারে তার বাগানের পেঁপে বিক্রি হয়। কোনো দিন দুই হাজার টাকা, আবার কোনো দিন তিন থেকে চার হাজার টাকারও বিক্রি হয়। মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। এই আয় দিয়ে সংসারের অনেক খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে।
‘শখের কাজটা যে এতটা কাজে লাগবে, আগে বুঝিনি। এখন মনে হয়, জায়গা থাকলে আরও বড় করে পেঁপে চাষ করতাম,’ বলেন কামাল।
বাগানেই মিলছে ক্রেতা
পেঁপে বিক্রির জন্য আলাদা করে বাজারে যেতে হয় না কামাল হোসেনকে। রসুলপুর থেকে রাখাইন পল্লী মিশ্রীপাড়ার দিকে যাওয়ার সড়কের পাশেই তার বাগান। ফলে কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের অনেকেই রাস্তা থেকে বাগান দেখে গাড়ি থামান। পাকা পেঁপে দেখলে কেউ কেউ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনে নেন।
এতে উৎপাদিত পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ঝামেলা কমেছে কামালের। অন্যদিকে পর্যটকরাও বাগান থেকে সদ্য পেড়ে দেওয়া টাটকা ফল কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।
কামাল হোসেনের ছেলে বলেন, বাবা যখন প্রথম পেঁপে গাছ লাগান, তখন পরিবারের কেউ এটিকে বড় কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখেননি। ইউটিউব দেখে নিজের মতো করে শিখে তিনি চাষ শুরু করেন। পরে গাছে ফল আসতে শুরু করলে এবং নিয়মিত বিক্রি হতে থাকলে পরিবারের সবাই উৎসাহিত হন।
তিনি বলেন, ‘এখন বাগানের কাজে পরিবারের সবাই কোনো না কোনোভাবে সহযোগিতা করি। পেঁপে পাড়া, গাছের পরিচর্যা কিংবা বিক্রির সময় ক্রেতাদের ফল দেওয়া—সব কাজেই আমরা থাকি। বাবার শখের কাজটা এখন পরিবারের আয়ের বড় একটি উৎস হয়েছে, এটিই সবচেয়ে ভালো লাগে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এলাকায় অনেকেই মনে করেন, লবণাক্ততার কারণে সব ধরনের ফসল চাষ করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাবার বাগান দেখে এখন অনেকেই জানতে চান কীভাবে চাষ করছেন, কী ধরনের চারা লাগিয়েছেন এবং কত খরচ হয়েছে।’
আগ্রহ বাড়ছে আশপাশের কৃষকদের
প্রতিবেশী রহিম মুসল্লী বলেন, কামাল হোসেনের বাগান হওয়ার আগে বাড়ির আঙিনায় পেঁপে চাষ করে এভাবে আয় করার বিষয়টি তারা দেখেননি। প্রথমে কয়েকটি গাছ থাকলেও এখন পুরো জায়গাজুড়ে পেঁপে গাছ ও ফল।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো, বাগানের সামনে বসেই পেঁপে বিক্রি হচ্ছে। তার বাগান দেখে আশপাশের মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এখন নিজেদের জায়গায় পেঁপে চাষের কথা ভাবছেন। বাড়ির আশপাশের খালি জায়গা কাজে লাগাতে পারলে কৃষকের বাড়তি আয় হতে পারে।’
পর্যটন ও কৃষিকে যুক্ত করার সুযোগ
ঢাকার মহাখালী থেকে মিশ্রীপাড়া ঘুরতে আসা এক পর্যটক দম্পতি বলেন, কুয়াকাটায় বেড়াতে এসে রাস্তার পাশে পেঁপের বাগান দেখে তারা গাড়ি থামিয়েছেন। বাজারের দোকানের পরিবর্তে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফল কেনার অভিজ্ঞতা তাদের কাছে ভিন্ন রকম লেগেছে।
তারা বলেন, ‘গাছ থেকে পেড়ে দেওয়া টাটকা পেঁপে পরিবারের জন্য কিনেছি। পর্যটন এলাকায় এ ধরনের স্থানীয় কৃষি উদ্যোগ পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয় হতে পারে।’
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কুয়াকাটায় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আগ্রহের জায়গাতেও পরিবর্তন আসছে। অনেক পর্যটক এখন সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও কৃষির সঙ্গে পরিচিত হতে চান।
তিনি বলেন, ‘কামাল হোসেনের পেঁপে বাগানের মতো উদ্যোগ পর্যটন ও স্থানীয় কৃষিকে একসঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করছে। পর্যটকরা বাগান দেখছেন, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কিনছেন। এতে কৃষক সরাসরি বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন, আর পর্যটকরাও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তাজা পণ্য কেনার অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন।’
লবণাক্ত মাটিতেও সম্ভাবনা
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন বলেন, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে অনেক কৃষক নতুন ফসল চাষে ঝুঁকি নিতে চান না। তবে সঠিক জাত নির্বাচন, মাটি ও পানির ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিকূল পরিবেশেও বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘কামাল হোসেনের পেঁপে বাগানটি একটি ভালো উদ্যোগ। বাড়ির আঙিনা বা পতিত জায়গা কাজে লাগিয়ে তিনি যে আয় করছেন, তা অন্য কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণার হতে পারে।’
তবে পেঁপে চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিবেশ, মাটির লবণাক্ততা, সেচের পানির গুণগত মান এবং রোগবালাই ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে বলে জানান তিনি।
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: