ধরলা নদী ফিরছে প্রাণে, ভাঙন কমায় স্বস্তিতে তীরবর্তী মানুষ
দীর্ঘদিনের ভরাট, নাব্যতা সংকট ও ভয়াবহ নদীভাঙনের জন্য পরিচিত আন্তঃসীমান্ত ধরলা নদী এখন ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে। নদীতে চলমান ড্রেজিং কার্যক্রমের ফলে নদীর গভীরতা বাড়ছে, ভাঙন কমছে এবং তীরবর্তী মানুষের জীবনে ফিরে আসছে স্বস্তি। স্থানীয়দের মতে, বহু বছরের ভাঙন আতঙ্ক থেকে এখন অনেকটাই মুক্তি মিলছে।
ভারতের কুচবিহার থেকে উৎপত্তি হয়ে পাটগ্রামের চ্যাংড়াবান্ধা হয়ে লালমনিরহাটের মোগলহাট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ধরলা নদী কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী, সদর ও উলিপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উলিপুরের বুড়াবুড়ি এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়। প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গড়ে ১ দশমিক ২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই নদীটি গতিপথ পরিবর্তন ও ভাঙনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ ছিল।

নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পুনর্ভবা নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ সালে ২৬৩ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের পাটেশ্বরী এলাকা থেকে উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার নদী খনন কাজ শুরু হয়।
বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরচন্দ্র পাল জানান, নদীর নাব্যতা রক্ষায় পানির লেভেল থেকে সাড়ে আট ফুট গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি দুইটি প্যাকেজের আওতায় সাতটি লটে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং বর্তমানে ১৪টি কাটার-সাকশন ড্রেজারের মাধ্যমে কাজ চলছে।

তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় মোট ১ কোটি ৬০ লাখ ঘনমিটার মাটি উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১ কোটি ৩ লাখ ঘনমিটার মাটি ও বালি উত্তোলন করা হয়েছে। উত্তোলিত মাটি ও বালি নদীর দুই তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশে, খাস জমিতে, নিচু জমি ভরাট এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া ধরলা সেতু সংলগ্ন প্রস্তাবিত ৩০ একরের ডিসি পার্কের গর্ত ভরাটসহ বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও ফ্লাড শেল্টার এলাকায়ও এসব মাটি ব্যবহার করা হয়েছে।
ড্রেজিংকৃত বালুর একটি অংশ রয়্যালটির মাধ্যমে বিক্রি করে ইতোমধ্যে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৮১ হাজার ১১১ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে। প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ৩০ জুন। বর্তমানে প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ধরলা নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবনে এই ড্রেজিং প্রকল্প ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। প্রকল্পটির ডিজাইন, তদারকি ও ডিজিটাল হাইড্রোগ্রাফিক জরিপসহ সার্বিক মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করছে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গঠিত ড্রেজিং ও ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়মিতভাবে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধরলা নদীর ভরাট প্রবণতা প্রায় ৯৭ শতাংশ হওয়ায় নিয়মিত খনন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা না হলে আবারও নাব্যতা সংকট দেখা দিতে পারে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের জগমোহনের চর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আগে বর্ষা এলেই মনে হতো এবার হয়তো বাড়িঘর নদীতে চলে যাবে। রাত জেগে পাহারা দিতে হতো। এখন নদী অনেকটা শান্ত হয়েছে, পানি দ্রুত নেমে যায়। ভাঙনের ভয়ও আগের মতো নেই।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মোগলবাসা ইউনিয়নের নিধিরাম গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনে আমরা অনেক জমি হারিয়েছি। এখন খননের মাটি দিয়ে অনেক পতিত নীচু জমি ভরাট হয়েছে। কিছু জমি আবার চাষের উপযোগী হয়েছে। এতে আমাদের বড় উপকার হয়েছে।
উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ী ইউনিয়নের সরকারপাড়ার বাসিন্দা শেফালী বেগম বলেন, আগে বর্ষায় পানি জমে থাকত, ঘরবাড়ি নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকত। এখন পানি দ্রুত নেমে যায়। মানুষ আবার নদীর ধারে বসবাসের সাহস পাচ্ছে।
এদিকে, ২০২৫ সালের ২২ মে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ধরলা নদী খনন কার্যক্রম নিয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানা বলেন, নদী খননের ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে এবং নদীভাঙন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। অতীতে নদীভাঙনের ফলে সৃষ্টি হওয়া বিভিন্ন নালা খননকৃত মাটি দিয়ে ভরাট করায় কয়েকশ একর জমি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও এলাকাবাসীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, ভাঙন কমেছে এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমেছে।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ১৯৫০ সাল থেকে কুড়িগ্রামের ১৬টি নদ-নদীতে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ধরলার ভাঙনে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে ঠিকানা বদল করতে বাধ্য হয়েছে। পাটেশ্বরী থেকে বেগমগঞ্জ পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার খননের ফলে ভাঙন অনেকাংশে কমেছে। তবে পুরো সুফল পেতে ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কর্ণপুর এলাকা থেকে বেগমগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার নদী খনন করা জরুরি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন জানান, নদী খননের ফলে উত্তোলিত বালু ও মাটি দিয়ে নদীর দুই তীরের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়্যালটির মাধ্যমে এক কোটি ৭৩ লাখ ৮১ হাজার ১১১ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, ধরলা নদীর ড্রেজিং কার্যক্রমের সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। জনগণের স্বার্থে পুরো নদীতে খনন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।
তবে, স্থানীয়দের আশা চলমান প্রকল্প সফলভাবে শেষ হওয়ার পাশাপাশি পুরো ধরলা নদীজুড়ে খনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে ভাঙন আতঙ্ক থেকে স্থায়ী মুক্তি পাবে নদী তীরবর্তী লাখো মানুষ।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: