• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬

কে এই ‘সিরিয়াল কিলার ভবঘুরে সম্রাট’? বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশিত: ১৯:০০, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ
কে এই ‘সিরিয়াল কিলার ভবঘুরে সম্রাট’? বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

সাভারে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার আলোচিত ‘সিরিয়াল কিলার’ মশিউর রহমান সম্রাটের বিষয়ে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার আসল পরিচয় প্রকাশ করেছে পুলিশ। প্রায় সময় সাভার মডেল থানার আশপাশে ঘুরে-বেড়ানো সম্রাট নিজেকে ‘কিং সম্রাট এবং মশিউর রহমান খান সম্রাাট বলে দাবি করলেও, পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার প্রকৃত নাম সবুজ শেখ। 

সবশেষ গত রবিবার জোড়া খুনের ঘটনায় গ্রেফতারের পর তার নাম প্রকাশ্যে আসে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান তার পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
 
সবুজ শেখ মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে। তিন ভাই চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সবুজ শেখ। তার বড় বোনের নাম শারমিন। তাদের নানা বাড়ি বরিশালে।

হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামের স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয়। গ্রামের সবাই তাদের ভয়ংকর এবং ডাকাত ফ্যামিলি হিসেবে চিনত।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নিজ পরিচয় গোপন করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভবঘুরে নারীদের পরিত্যক্ত ভবনের নির্জন স্থানে নিয়ে আসতো সিরিয়াল কিলার সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ। সেসব নারীরা অন্য কারো সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদের হত্যা করতো বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।’ 

এ ছাড়া আদালতে জবানবন্দি দেওয়া হত্যাকাণ্ডের তথ্য ও পরিচয়সহ সকল তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তার গ্রামের বাড়িতে পুলিশের টিম পাঠানো হয়েছে। 
 
তিনি আরও বলেন, ‘সবশেষ ঘটনার ৩-৪দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতলায় নিয়ে হত্যা করে সম্রাট। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে লাশ কাঁধে করে নিয়ে দোতলার টয়লেটে ঢুকিয়ে দুজনকে একসঙ্গে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

পরবর্তী সময় ভবনটির আশপাশে থাকা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্তের পর অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়।’ 

গতকাল সোমবার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে জিজ্ঞাসাবাদে সে ৬টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শেষে সবুজ শেখ ওরফে সম্রাটকে গত রাতেই তাকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন আদালত। 

এদিকে, সিসিটিভি ফুটেজে যে তরুণীকে হত্যার পর কাঁধে করে নিয়ে যেতে দেখা যায় সিরিয়াল কিলার সম্রাট ওরফে সবুজ শেখকে। নিহত ওই তরুণীর পরিচয় পাওয়া গেছে। হত্যার পর ভাইরাল হওয়া ওই তরুণীর আগের দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার দেখে তার পরিবারের সদস্যরা সাভার মডেল থানায় ছুটে আসেন। 

সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘নিহত ওই তরুণীর নাম তানিয়া আক্তার। তার বাবার নাম মৃত জসিম। মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী তানিয়া মায়ের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরায় ভাড়া বাসায় থাকতো। চার বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। গত ১ জানুয়ারি থেকে সে নিখোঁজ ছিল বলে জানিয়েছে পরিরারের সদস্যরা।’ 
 
সাভার থানা পুলিশ জানায়, ভবঘুরে প্রকৃতির সম্রাট গত কয়েক বছর ধরে মূলত সাভার মডেল থানার সামনে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাব রেজিস্ট্রার অফিসের আশপাশ, সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও পাকিজার মোড়ে ঘোরাফেরা এবং রাত্রি যাপন করত। রবিবার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে জোড়া খুনের পর গ্রেপ্তারকৃত সম্রাট নিজের যে নাম, বাবার নাম সালাম এবং মায়ের নাম রেজিয়াসহ ব্যাংক কলোনী এলাকার বাড়ির ঠিকানা বলেছে, তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে ওই এলাকায় ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট। সিরিয়াল কিলার সবুজ শেখ নিজের পুরো নাম ওই কাউন্সিলরের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলছে। 

ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ৬ খুনের কথা স্বীকার করলেও খুনের কারণ হিসেবে একেকবার একেক রকম দাবি করেছে। সে একজন বিকৃত রুচির মানুষ, সাইকো প্যাথ।

অন্যদিকে, কারামুক্ত একাধিক হাজতি জানিয়েছেন, আট মাস আগে এই সম্রাট কাশিমপুর-২ কারাগারে ৬০ নম্বর সেলের পূর্ব বিল্ডিংয়ের নিচতলার বন্দি ছিলেন। কারাগারের ভেতর সে ছিল বেপরোয়া। সবসময় বিড়ি খেত এবং একা একা কথা বলতো। নিজেকে কিং খান সম্রাট দাবি করা প্রচণ্ড সাহসী সাইকো সম্রাট জেলাখানায় বিড়ির জন্য অন্যদের মারধর করত। প্রায়ই চুরি করায় কারা কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে বিপদে ছিল। অন্য বন্দিদের অভিযোগের কারণে তাকে কারা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে সেখানে চিকিৎসকের মোবাইল চুরি করে। 

প্রসঙ্গত, ৭ মাস আগে ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের সামনে অজ্ঞাতনামা এক বৃদ্ধার (৭৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। তার নাতি মামলা দায়ের করলে পরে আসমা বেগম নামের এই বৃদ্ধার পরিচয় মিলে। এরপর ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট পৌর এলাকার পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের (৩০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই স্থানে ১১ অক্টোবর অজ্ঞাতনামা এক নারীর (৩০) লাশ পাওয়া যায়। এরপর ১৯ ডিসেম্বর সেখান থেকে অজ্ঞাতনামা আরও এক পুরুষের (৩৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। 

এসব ঘটনা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করলে কমিউনিটি সেন্টারের আশপাশে সিসিটিভি এবং লাইট লাগানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। সবশেষ ১৮ জানুয়ারি পুলিশ দুটি পোড়া লাশ উদ্ধার করে। এরপর সিসিটিভি ফুটেজে একটি লাশ সরাতে দেখা যায় সম্রাটকে। তারপর পুলিশ তাকে আটক করে।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সর্বশেষ ঘটনার আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে কমিউনিটি সেন্টারে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতালয় নিয়ে হত্যা করে সে। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলে বলেও জানিয়েছে কথিত এই সিরিয়াল কিলার।

মো. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, সম্রাটের বক্তব্য কতটা যুক্তিযুক্ত বা আদৌ সত্য কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আশা করি চার্জশিট দাখিলের আগেই সব বিষয় স্পষ্ট করা সম্ভভ হবে।’

যোগাযোগ করা হলে ঢাকা জেলার ডিবির (উত্তর) পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম বলেন, সম্রাট তার বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে পৌর এলাকার ৫ নং ওয়ার্ডের ব্যাংক কলোনি এবং তার বাবার নাম মৃত সালাম এবং মৃত রেজেয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে ছয় খুনের ঘটনায় আটক ব্যক্তির পুলিশের পোশাক পরিহিত একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরমান আলী জানান, বিষয়টি আমার নজরেও এসেছে। হতে পারে পুলিশের কোনো সদস্য তার অব্যহৃত পোশাক মানবিক কারণে তাকে দিয়েছে। আর এটি করে থাকলেও তা সঠিক হয়নি। আমার মতে, তাকে একজন বিকৃতরুচির মানুষ, সাইকোপ্যাথ বলেই মনে হয়েছে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম জানান, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে একে একে  ৬টি হত্যাকাণ্ডে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এর আগে তাকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হলে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় পরে রিমান্ড মঞ্জুর না করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে আটক হওয়ার পর নিজের নাম পরিচয় গোপন করে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, দেখুন আসামি সব সময় পুলিশকে বিভ্রান্ত করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা বসে নেই। অনুসন্ধান চালিয়ে তার আদ্যপান্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামে অনুসন্ধান এখনো চলমান রয়েছে। জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয়। তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে সবাই চেনে। এছাড়াও এই আসামি এর আগে কাশিমপুর-২ কারাগারে ৬০ নম্বর সেলের পূর্ব বিল্ডিংয়ের নিচতলায় বন্দি ছিল বলেও জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

এ বিষয়ে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আমরা ওই আসামির আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেছি। কিন্তু কোন তথ্যের সাথে ম্যাচ করেনি। তার মানে তার কোন ভোটার কার্ড নেই। ভয় নেই। জালিয়াতি ও ছদ্মবেশ এড়াতে কারাগারে প্রবেশের মুহূর্তে অটোমেডেট ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেনটিফিকেশন সিস্টেমে তার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছে। যে নামই হোক না কেন, কারাগারের রেকর্ডে এবার তার অপরাধের খতিয়ান অন্তর্ভুক্ত, আয়নাবাজির সুযোগ নেই।

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত