• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২

ফারইস্ট ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান কারাগারে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:১৭, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

আপডেট: ২০:২১, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

ফন্ট সাইজ
ফারইস্ট ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান কারাগারে

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম

চার দিনের রিমান্ড শেষে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদার আদালত আসামির রিমান্ডের আবেদন নামঞ্জুর করে এই আদেশ দেন।

এর আগে, চার দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নজরুলকে ফের ৮ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। এ সময় আসামি নজরুল ইসলামের পক্ষে তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিলের আবেদন করেন। 

অপরদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক রিমান্ডের আবেদন নামঞ্জুর করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম নজরুল ইসলামের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

উল্লেখ্য, ‘প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশন’ ও ‘পিএফআই প্রোপার্টিজ লিমিটেড’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভেঙে দেওয়া পরিচালনা পর্ষদ। ১৫৮তম পর্ষদ সভার ভুয়া সারসংক্ষেপ তৈরি করে সেটির বরাত দিয়ে এই পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামসহ ৯ শীর্ষ কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে এই অর্থ হাতিয়ে নেন। এই অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।

এ অর্থ সাধারণ গ্রাহক এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)র গভীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই তথ্য। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পৃথক ২টি মামলা করেছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার সংস্থার সহকারি পরিচালক শারিকা ইসলাম এবং সহকারি পরিচালক বায়েজিদুর রহমান বাদী হয়ে মামলা দু’টি দায়ের করেন।

এজাহারে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’র সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক কেএম খালেদ,অডিট কমিটির চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খালেদ,পরিচালক এম.এ.খালেক,পরিচালক মো: মিজানুর রহমান, পরিচালক ফরিদউদ্দিন এফসিএ, পরিচালক আসাদ খান, কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আব্দুল আজিজ এবং বরখাস্তকৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্যাহকে এজাহারে আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিঃ ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং কয়েকটি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৬শ’ ৫২ কোটি এমটিডিআর বা মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট সঞ্চয় স্কিম করে। পরবর্তী তিন বছরে আরও ৫’শ ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এরপর ২০১৮ সালে এই সঞ্চয় স্ক্রীম এবং বিনিয়োগকৃত টাকা নগদায়ন করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পরিচালক মন্ডলী নিজ নিজ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ঋণ পরিশোধের খাতে ব্যয় দেখানো হয়। এছাড়া এক হাজার ৩১৩ কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালকরা তাদের ব্যক্তিগত অন্ততঃ ১৩টি প্রতিষ্ঠানে এ অর্থ সরিয়ে নেয় হয়। এরমধ্যে প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি ও পিএফআই প্রপার্টিজে’র মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বৈধ কোনো নথিপত্রই নেই।  

জানা গেছে, ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ১৬৪তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় ১৭টি ব্যাংকে এমটিডিআর খোলা এবং লিজিং কোম্পানিতে বিনিয়োগ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ফারইস্ট লাইফের এমটিডিআর লিয়েন/জামানত রেখে প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশকে বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানের বিষয়ে ওই সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফারইস্টের তৎকালিন চেয়ারম্যান মোঃ নজরুল ইসলাম এবং তৎকালিন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্যাহ পারষ্পরিক যোগসাজশে অন্যায়ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনকে বিনিয়োগ/ঋণ সুবিধা দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৬৪ তম পর্ষদ সভার কার্যবিবরণীর ভুয়া সার-সংক্ষেপ তৈরি করেন। এই ভুয়া সার-সংক্ষেপের ভিত্তিতে প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনকে ১৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ সুবিধা দেয়া হয়। এটি মূলতঃ ফারইস্টের তৎকালিন চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামেরই একটি প্রতিষ্ঠান। ফারইস্টের পরিচালক কেএম খালেদ প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান। শাহরিয়ার খালেদ প্রতিষ্ঠাটির পরিচালক। প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনকে ১৬ কোটি টাকা দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি ওই টাকা আর পরিশোধ করেনি। ফলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখাকে মুনাফাসহ ২২ কোটি ৫৭ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭৪ টাকা সমন্বয় করে।

অন্যদিকে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখায় ২২টি এমটিডিআর খুলে ১শ’ ১ কোটি টাকা রাখে। এই টাকার বিপরীতে মোঃ নজরুল ইসলামের মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান পিএফআই প্রোপার্টিজ লি: ৪০ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা নেয়। পিএফআই প্রোপার্টিজ এই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে মুনাফাসহ দায়ের অংক দাঁড়ায় ৭০ কোটি ৮৩ লাখ ৬৯ হাজার ৪৩৯ টাকা। এই অর্থ এমটিডিআর থেকে এ দায় সমন্বয় করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পারষ্পরিক যোগসাজশে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিঃ (এফআইএলআইসিএল)-এর ১৫৮ তম পর্ষদ সভার কার্য বিবরণীর ভুয়া সার-সংক্ষেপ সৃজন করে এ সার-সংক্ষেপের বরাত দিয়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লি:র ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার, মতিঝিলে ‘এফআইএলআইসিএল’র নামে রক্ষিত ২২টি এমটিডিআর জামানত রেখে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে পিএফআই প্রপার্টিজ লিমিটেডকে ৪০ কোটি টাকার ঋণ/বিনিয়োগ সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৭০ কোটি ৮৩ লাখ ৬৯ হাজার ৪৩৯ টাকা আত্মসাত করেন। যা ১৮৬০ সালের দন্ডবিধি ১০৯ ও ৪০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন,২০১২ এর ৪(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এমএ খালেক,  কেএম খালেদ, ফরিদউদ্দিন, মিজানুর রহমান, আসাদ খান এবং এমএ খালেকের ছেলে শাহরিয়ার খালেদ একই সঙ্গে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি: এবং ‘প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশন’র পরিচালনা পর্ষদ সদস্য। সুতরাং ফারইস্ট’র চেয়ারম্যান মোঃ নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়তে উল্যাহ, কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আব্দুল আজিজ এবং এফআইএলআইসিএল ও প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশনের পরিচালক এম.এ.খালেক, কেএম খারেদ, ফরিদউদ্দিন, মিজানুর রহমান,আসাদ খান ও শাহরিয়ার খালেদদের যোগসাজশের মাধ্যমে আত্মসাতের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটির ৪০ কোটি টাকা তাদেরই মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পি.এফআই প্রোপার্টিজ লিমিটেডকে ঋণ দিয়েছে। পরবর্তীতে এ ঋণ পরিশোধ না করে আত্মসাত করেন। এর ফলে ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

দুদকের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স’ থেকে নিজেদেরই মালিকানাধী ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে অন্তত: সাড়ে ৮শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটির বিগত পরিচালনা পর্ষদ। ব্যাপক দুর্নীতি,অনিয়ম আর লুটপাটের প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে দেয় পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ।  
 

বিভি/এইচএস

মন্তব্য করুন: