ভাষা আন্দোলনের ‘সচিবালয়’ ঢাবি`র সলিমুল্লাহ মুসলিম হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠাকালে শহীদুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো। পরে বাংলার তৎকালীন গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য স্যার ফ্রান্সিস স্ট্যানলি জ্যাকসন মুসলিম হলের নাম পরিবর্তন করে ঢাকার প্রয়াত নবাব বাহাদুর স্যার সলিমুল্লাহর নামানুসারে সলিমুল্লাহ মুসলিম (এস.এম) হল রাখেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পড়তে আসা মুসলিম ছাত্রদের থাকার জন্য নির্মাণকৃত হলগুলোর মধ্যে এস.এম হলই সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী।

শতবর্ষী এই হলের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে বিশিষ্ট গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ 'সলিমুল্লাহ মুসলিম হল' নামে একটি বই লিখেছেন। তাঁর বইয়ে হলের প্রথম যুগের ইতিহাস ছাড়াও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই হলের শিক্ষার্থী অংশ গ্রহণ, ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে হলের ভবনকে কন্ট্রোল রুমকে হিসেবে ব্যবহার করা ও দেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে হলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান তুলে ধরেছেন। ভাষার জন্য বাঙালীর আন্দোলন মূলত এস এম হলকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হওয়ায় এ হলকে ভাষা আন্দোলনের ‘সচিবালয়’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্রসমাজের দূর্বার আন্দোলন বানচালের উদ্দেশ্যে ১৯৫২-এর ২১ শে ফেব্রুয়ারি সরকার ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভাঙার পর ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, বিক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা সন্ধ্যায় এসএম হলে সমাবেত হয়। ভাষা আন্দোলনকে জোরদার করতে সেদিন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী একরামুল আমিনের নেতৃত্বে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদী ছাত্ররা সর্বসম্মতি ক্রমে হরতাল পালন, কালো ব্যাজ ধারণ, পতাকা অর্ধনমিত, গায়েবানা জানাজাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। পরে আন্দোলন তরান্বিত করতে হলের মিলনায়তনে বিভিন্ন কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দফতর খোলা হয়। এসএম হল তখন হয়ে উঠেছিলো আন্দোলনের ‘কমান্ড পোস্ট’ এবং হলের সচিবালয় রূপান্তরিত হয় আন্দোলনের কন্ট্রোল রুমে। হলের দোতলার চতুর্দিকে বসানো মাইক্রো-ফোনের লাউডস্পীকার থেকে বাজতে থাকে বক্তৃতা, স্লোগান, ঘোষণা। কলাপসিবল গেইট তালাবন্ধ থাকায় সেদিন হল পরিণত হয়েছিলো মধ্যযুগীয় দূর্গে। হলের লাউডস্পীকারের ঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দানে ২১ তারিখ থেকে ৫ দিনের টানা ধর্মঘটে নাগরিক জীবন অচল হয়ে পড়ে এবং সরকারের টনক নড়ে। এভাবে শুধু মাইক্রোফোন চালু রেখে একটি গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা ও তা এগিয়ে নেওয়ার ইতিহাস রচিত হয় এই হলের প্রাঙ্গণে।
পরে ২৫ ফেব্রুয়ারি ভীত সন্ত্রস্ত সরকার পুলিশ দিয়ে হল ঘেরাও করে এবং ডিনামাইট দিয়ে হল ভবন উড়িয়ে দেওয়ার গুজব ছড়ায়। এক পর্যায়ে হলের রুমের দরজা-জানালা ভেঙে পুলিশ ছাত্রদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সময় কাগজপত্র বাক্স, প্লেট, বই, কলম তছনছ করে। আন্দোলনের সচিবালয় দখল করে অনেক প্রচারপত্র, বিজ্ঞাপন, পুস্তিকা আর পোষ্টার পুলিশের করায়ত্ত করা হয়। আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। ফলে আন্দোলনকারীরা সমর্পন করতে বাধ্য হলেও দেশের সর্বত্র হরতাল চলতে থাকে।
বিভি/এআর/রিসি



মন্তব্য করুন: