হিন্দুকুশের বুক চিরে কাবুলযাত্রা
আফগানিস্তানে দুঃসাহসিক ভ্রমণ
নাজমুন নাহার
আমার বিশ্বভ্রমণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আফগানিস্তানের মাটিতে পা রাখা। বহুদিনের দুর্গম এক স্বপ্ন—অবশেষে তা পূরণ হলো ইতিহাস ও মাটির টানে। দুঃসাহসিক পথ পেরিয়ে খাইবার পাস অতিক্রম করার অভিজ্ঞতা ছিল রোমাঞ্চে ভরা। অজানা আশঙ্কা, দুর্গম যাত্রা আর ‘কাবুলিওয়ালার দেশ’কে নিজের চোখে দেখার গভীর আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে এক অনন্য অনুভূতি। শেষ পর্যন্ত আমি সেই স্বপ্নের দেশকে আবিষ্কার করেই ফেললাম।
পথে পথে অসংখ্য পুলিশি চেকপোস্ট, পাহাড় ঘেঁষে আঁকাবাঁকা সড়ক—সব যেন সাহস ও ধৈর্যের কঠিন পরীক্ষা। তবে প্রকৃতির পাহারায় ঘেরা এই দেশ তার মায়াময় রূপে আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
রাজধানী কাবুল-এর নান্দনিক দৃশ্য, পাহাড়ে ঘেরা শহরের বিস্তৃতি আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছোট ছোট জনপদ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখানকার মানুষের জীবনযাপন সরল, তবে সংগ্রামময়। তবু তাদের আতিথেয়তা ও আন্তরিকতা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রাচীন ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য মিলিয়ে এই দেশ আমার ভ্রমণজীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
আমার পুরো অভিযাত্রা ছিল সড়কপথে। পেশোয়ার থেকে জালালাবাদ হয়ে কাবুল পর্যন্ত সেই দুর্গম অথচ অপূর্ব সুন্দর পথ আজও মনে দোলা দেয়। কখনো মনে হয়—আমি কি সত্যিই সেই ভয়ংকর সুন্দর পথ অতিক্রম করেছিলাম? প্রকৃতির রূপে এতটাই মুগ্ধ ছিলাম যে ভুলেই গিয়েছিলাম—এই অঞ্চলেই কখনো কখনো হঠাৎ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে।

পাহাড় ও প্রকৃতির কোনো রাজনীতি নেই; তারা নির্মল ও উদার, কেবল সৌন্দর্য বিলিয়ে যায়। জালালাবাদ থেকে কাবুল যাওয়ার প্রধান সড়কটি আফগানিস্তানের অন্যতম সুন্দর ও রোমাঞ্চকর পথ। এই পথে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা কাবুল নদী আমার যাত্রাকে একই সঙ্গে মনোমুগ্ধকর ও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল। কখনো নদীটি রাস্তার একদম গা ঘেঁষে, কখনো গভীর খাদে নেমে গেছে—দৃশ্যটি ছিল শ্বাসরুদ্ধকর। ছোট্ট গাড়ির জানালা দিয়ে আমি সারা পথ তাকিয়ে ছিলাম। কোথাও কোথাও পাথুরে পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো পড়ে মূল্যবান খনিজের ঝিলিক দেখা যেত—মুহূর্তেই মনে হতো যেন রূপকথার রাজ্যে এসে পড়েছি। স্বপ্নের মতো দৃশ্যগুলো উল্কার মতো চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছিল।
পাহাড়ি গিরিখাতের দুর্গমতার কারণে এই সড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে—শোনা যায় দিনে গড়ে কয়েকটি দুর্ঘটনা হয়। তবু ভয়কে জয় করে আমি প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম।

এই পথটি মূলত বিখ্যাত কাবুল গর্জ অতিক্রম করে, যা হিন্দুকুশ পর্বতমালা-এর অংশ। চারদিকে উঁচু-নিচু দুর্গম পাহাড়, খাড়া পাথুরে ঢাল আর আঁকাবাঁকা রাস্তা—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। রুক্ষ প্রকৃতি, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা নদী আর দুঃসাহসিক পাহাড়ি পথ—জালালাবাদ থেকে কাবুলের এই যাত্রা আমার ভ্রমণজীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে আছে।
কাবুল পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত ও ঐতিহাসিক শহর। প্রাচীন সিল্ক রোড-এর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে একসময় এটি ছিল বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার মিলনভূমি। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক বালা হিসার দুর্গ, যা শহরের প্রাচীন গৌরবের সাক্ষী। শান্ত সৌন্দর্যে ঘেরা বাবর গার্ডেন-এ সমাহিত আছেন মুঘল সম্রাট বাবর। আর হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে আফগানিস্তান জাতীয় জাদুঘর। পাহাড়ে ঘেরা এই শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনি এর অলিগলিতে লুকিয়ে আছে সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের ইতিহাস সত্ত্বেও কাবুলের মানুষ আশায় বাঁচে। প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা জীবনের আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। কাছ থেকে তাদের জীবনসংগ্রাম, ভালোবাসা আর স্বপ্ন দেখার সাহস প্রত্যক্ষ করে আমার ভেতরে গভীর মানবিক অনুভূতির জন্ম হয়েছে। কাবুল আমার কাছে ইতিহাস, সংগ্রাম ও আশার এক জীবন্ত প্রতীক।
হয়তো আবার কোনো একদিন দেখা হবে—কাবুলের রাস্তায় হেঁটে, সেই পরিচিত পাহাড়ঘেরা শহর আর তার মানুষদের সঙ্গে।



মন্তব্য করুন: