মাটির হাড়িতে মহিষের দুধের টকদই, অর্ধশতাব্দীর ইতিহাস!
ছবি: নঈম মিয়ার বাজার
ভোর পেরোতেই বাজারজুড়ে শুরু হয় হাঁকডাক। সারি সারি মাটির হাঁড়িতে সাজানো টক দই—চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে দুধ আর মাটির মিশ্র গন্ধ। দৃশ্যটা নতুন নয়। প্রায় ৫৫ বছর ধরে সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার এমনই চেনা রূপ নেয় জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার নঈম মিয়ার বাজার।
তবে এটি কোনো সাধারণ দইয়ের হাট নয়। এখানে বিক্রি হয় মহিষের খাঁটি দুধে তৈরি টক দই—যার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নানা প্রান্তে।

নদীঘেরা পথ থেকে বাজারের হাট: স্থানীয়দের তথ্যমতে, এই টক দইয়ের যাত্রা শুরু স্বাধীনতারও আগে। তখন চারদিকে নদী আর কাদামাটির পথ। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নড়বড়ে। সেই সময় বাড়িতেই তৈরি হতো টক দই। দই উৎপাদকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করতেন। বিয়ে কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে এই দই ছাড়া আয়োজন যেন পূর্ণতাই পেত না।
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে দৃশ্যপট। এলাকাবাসীর সুবিধার কথা ভেবে স্থানীয় প্রভাবশালী নঈম মিয়া প্রায় ১৫ একর জমির ওপর গড়ে তোলেন একটি বাজার। সেখান থেকেই নিয়মিত বসতে শুরু করে দইয়ের হাট। সময় বদলেছে, পথঘাট উন্নত হয়েছে—তবে মাটির হাঁড়িতে জমে থাকা সেই টক দইয়ের স্বাদ আজও অটুট।
ব্যবসা নয়, বংশপরম্পরার চর্চা: বকশীগঞ্জ সদর, সাধুরপাড়া ও বাট্টাজোড় ইউনিয়নের বহু পরিবার এখনো মহিষ পালন করে। দুধ বিক্রি না করে তারা বাড়িতেই তৈরি করেন টক দই। উৎপাদকদের অনেকেই বলেন, এটা তাদের কাছে শুধু ব্যবসা নয়—এ এক পারিবারিক ঐতিহ্য।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই পেশা ধরে রেখেছে এলাকার বহু পরিবারকে। বাজারে দই বিক্রি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি তারা আগলে রেখেছেন নিজস্ব সংস্কৃতি।
আধুনিকতার ভিড়ে টিকে থাকা পুরোনো স্বাদ: প্যাকেটজাত খাবারের যুগে এসেও নঈম মিয়ার বাজারে আজও বিক্রি হচ্ছে মাটির হাঁড়িতে দই। আধুনিকতার স্রোতের মাঝেও এখানকার মানুষ আঁকড়ে ধরে রেখেছেন শতাব্দী ছোঁয়া স্বাদ আর ঐতিহ্য।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই দই উৎপাদকরা আরও দীর্ঘ সময় ধরে এ অঞ্চলের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে পারবেন।
সময় বদলায়, শহর বড় হয়—কিন্তু নঈম মিয়ার বাজারের টক দই যেন এখনো বলে চলে পুরোনো দিনের গল্প। মাটির হাঁড়িতে জমে থাকা সেই স্বাদ আজও ফিরিয়ে নেয় মানুষকে শেকড়ে।
বিভি/এমআর



মন্তব্য করুন: