• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

রমেশ রাম গৌড়ের সাত লেয়ারের চা: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

মো. বেল্লাল হাওলাদার 

প্রকাশিত: ১০:৫৯, ৩০ মার্চ ২০২৬

ফন্ট সাইজ
রমেশ রাম গৌড়ের সাত লেয়ারের চা: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

সবুজের অপার সমারোহ আর চা বাগানের নরম সুবাসে ঘেরা চায়ের রাজধানী নামে খ্যাত শ্রীমঙ্গল, আমাদের দেশের পর্যটন মানচিত্রে এক অনন্য অনুভূতির নাম। প্রকৃতির এই লীলাভূমি পর্যটকদের যেমন চোখের শান্তি দেয়, তেমনি মনকে ভরিয়ে তোলে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। গত ২৫ মার্চ সিলেটে প্রাণের মেলা জাতীয় কবি পরিষদের ‘ঈদ পুনর্মিলনী, সৃজনশীলতার সম্মান ও মানবিকতার চর্চা’ শীর্ষক সম্মেলন ২০২৬-এর প্রস্তুতি উপলক্ষে সিলেটে যাওয়া হয় আমার। সেই ব্যস্ততার মাঝে সময় বের করে ঘুরে আসি শ্রীমঙ্গল। চায়ের এই রাজ্যে পা রাখতেই মনে হলো, এ যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করছি আমি। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চা বাগান, নীরব সবুজ আর প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় মন ভরে উঠলো মুহুর্তেই।

এই ভ্রমণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত ছিল বহু-স্তরের চায়ের উদ্ভাবক রমেশ রাম গৌড়-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ। অত্যন্ত আন্তরিক মানুষ তিনি। সম্মানের সঙ্গে আমাকে স্বাগত জানান, নিজের হাতে তৈরি সাত লেয়ারের চা পান করান, স্বাদে ও গন্ধে মন ভরে যায় আমার। তবে এই সম্মানটা পেয়েছি আমার কর্মরত প্রতিষ্ঠান দৈনিক বাংলাদেশ সমাচারের মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রতিনিধি ও স্থানীয় দু'জন মানবাধিকারকর্মীর সহযোগিতায়। তাঁরা আমাকে রমেশ রাম গৌড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমি কথা বলি তাঁর সঙ্গে। আসলে সবসময় মানুষের ভেতরের অদেখা গল্পগুলো আমাকে অদ্ভুতভাবে টানে। কোথাও গেলে অপরিচিত মানুষকে ঘিরে আমার মনে জন্ম নেয় নীরব কৌতূহল। জানতে ইচ্ছে করে তিনি কেমন, কী কাজ করেন, সংসারে কারা আছে। কেন এমন অনুভূতি জাগে, তার নির্দিষ্ট কোনো উত্তর আমার জানা নেই। তবে লেখক সত্তা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি মানুষই এক একটি জীবন্ত গল্প, শুধু দরকার মন দিয়ে শোনবার। সেই শোনবার আকাঙ্ক্ষায় আমাকে টেনে নেয় মানুষের কাছে, তাদের না বলা কথা শুনতে, তাদের ভেতরের আলো-অন্ধকার স্পর্শ করতে।

এই জানার তীব্র আগ্রহ থেকে আলাপ করি রমেশ রাম গৌড়-এর সঙ্গে। সাত লেয়ারের চায়ের উদ্ভাবক হিসেবে যিনি পরিচিত। সাধারণ কিছু প্রশ্ন দিয়ে শুরু হওয়া কথোপকথন ধীরে ধীরে উন্মোচন করে তাঁর জীবনের বহু অজানা অধ্যায়। নির্দ্বিধায় তিনি বলেন তাঁর সংগ্রামের গল্প, স্বপ্নের পথচলা আর অর্জনের ইতিহাস। তিনি আরও জানালেন, সফলতার পথে কিছু লোক বিভিন্ন ফন্দি কষেছিলো, কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো। তবুও তিনি অটল থেকে সৎভাবে নিজের পথ অব্যাহত রেখেছেন। সেদিন বুঝেছিলাম মানুষের জীবন কখনোই নিছক সাধারণ নয়; প্রতিটি জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য না বলা গল্প, যা শুধু একজন মনোযোগী শ্রোতার অপেক্ষায় থাকে। 

দীর্ঘ সময় আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর জীবনের না-না গল্প, সংগ্রাম, স্বপ্ন আর সাফল্যের অনন্য এক যাত্রা। আমার মনে হয়েছে, এই মানুষটি শুধু চা তৈরি করেন না; তিনি গল্পও তৈরি করেন, যা পাঠককে অনুপ্রাণিত করতে পারে, যা অনুসরণ ও অনুকরণের গল্প হয়ে উঠতে পারে।

চায়ের গুণ সম্পর্কে আমাদের অনেকের কম বেশি জানা আছে। বিশেষ করে মানুষের ক্লান্তি দূর করতে চায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই চা যখন হয়ে ওঠে স্তরবিন্যাসে সাজানো এক শিল্পকর্ম, তখন তা ভিন্ন মাত্রা পায়। শ্রীমঙ্গলের রমেশ রাম গৌড়ের এই বহু-স্তরের চা, যা সাত লেয়ারের চা নামে পরিচিত, ঠিক তেমনই এক বিস্ময়। একটি স্বচ্ছ গ্লাসে স্তরে স্তরে সাজানো চা। চামচ দিয়ে না ঘুটে যতই নাড়াচাড়া করুন এক স্তর আরেক স্তরে মিশবে না। যিনি প্রথম বিষয়টি দেখবেন তার কাছে এটি চা ভাবতেই কষ্ট হবে। প্রতিটি স্তরের স্বাদ আলাদা, তবুও একসঙ্গে তারা সৃষ্টি করে অপূর্ব সামঞ্জস্য। এই চা শুধু পানীয় নয়, এটি এক বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা।

রমেশ রাম গৌড়ের মুখে জানতে পারলাম, তাঁর জীবন শুরু হয়েছিলো খুব সাধারণভাবে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ছোট ব্যবসা করতেন তিনি। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে সব হারিয়ে ২০০০ সালে পরিবারসহ চলে আসেন শ্রীমঙ্গলে‌। সঙ্গে ছিলো মাত্র দেড় হাজার টাকা। প্রথমে চাকরি, পরে ছোট্ট চায়ের দোকান। এইভাবেই শুরু হয় তাঁর নতুন সাফল্যের কর্মময় জীবন। তাঁর চায়ের প্রতি ভালোবাসা আর নতুন কিছু করবার ভাবনা থেকে শুরু করেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তিনি ২০০২ সালে প্রথম তৈরি করেন দুই লেয়ারের চা। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে স্তর। তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত। ২০০৯ সাল থেকে সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয় আট লেয়ারের চা। পরবর্তীতে তিনি তৈরি করেন দশ লেয়ারের চা, যা বিশেষ অর্ডার ছাড়া তৈরি করা হয় না। জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি-এর মাধ্যমে এই চা আরও পরিচিতি পায়, যখন হানিফ সংকেত তাঁর প্রতিষ্ঠানে এসে এই চা পান করেন।

আমি অনুধাবন করলাম একটি ছোট উদ্যোগ কী ভাবে একটি অঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ এই চা। নীলকণ্ঠ টি-কেবিনকে কেন্দ্র করে শ্রীমঙ্গলে পুরো চায়ের বাগানজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বহু মানুষের কর্মসংস্থান। স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন ও পর্যটন খাতে এসেছে নতুন গতি।‌ এই রমেশ রাম গৌড়-এর এই উদ্ভাবন দেশীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমাদৃত হয়েছে। নীলকণ্ঠ টি-কেবিন এখন একটি পরিচিত ব্র্যান্ড হিসেবে গ্রহণ যোগ্যতা লাভ করেছে। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক আসেন। বিভিন্ন দেশের পর্যটক, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও এসেছেন এই চায়ের স্বাদ নিতে। আমার চোখে পড়েছে, দেশ-বিদেশের অনেক জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তাঁর সঙ্গে ছবি তুলেছেন, যা তাঁর প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে সযত্নে টানানো রয়েছে।

শুধু ব্যবসায়িক জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় রমেশ রাম গৌড়। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজে সহায়তা করে থাকেন। এতিমখানা, স্কুল-কলেজ এবং স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য, যা তাঁকে একজন সফল উদ্যোক্তার পাশাপাশি একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। এছাড়াও তিনি তাঁর এই বিশেষ চা তৈরির কৌশল পরিবারে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর তিন ছেলে ও ছোট ভাই মানিক রাম গৌড় এই চা তৈরিতে পারদর্শী। বড় ছেলে রাজিব রাম গৌড় ইতোমধ্যেই বাবার উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং নিজ গুণে মানুষের হৃদয় জয় করে চলেছেন।

শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে। নিরিবিলি পরিবেশে বসে এক কাপ বহু-স্তরের চা পান করা নিঃসন্দেহে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তবে পর্যটকদের বাড়তি চাপের কারণে কিছু বাস্তব সমস্যাও চোখে পড়ে, পুরো বাগানজুড়ে। বিশেষ করে পার্কিং সংকট। সরু সড়কে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে মাঝে মাঝে যানজট সৃষ্টি হয়, যা ভ্রমণের স্বস্তিকে ব্যাহত করে। এই দিকটি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে নির্দ্বিধায় বলা যায়, রমেশ রাম গৌড় শুধু একজন উদ্যোক্তা নন—তিনি এক অনুপ্রেরণার নাম। এক কাপ চা—কিন্তু তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে জীবনের বহু লেয়ারের গল্প।

লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক

বিভি/এআই

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত