ইশারায় কথা, অধিকারও সবার: আজ আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস
শব্দ ছাড়াই কথা বলা যায়। অনুভূতি, প্রয়োজন, ভালোবাসা কিংবা প্রতিবাদের ভাষাও প্রকাশ করা যায় হাতের ইশারা ও অঙ্গভঙ্গিতে। শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই ইশারা ভাষা। তাদের ভাষাগত অধিকার ও মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ২৩ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০১৭ সালে ২৩ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ইশারা ভাষার গুরুত্ব এবং বধির মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য।
এবারের প্রতিপাদ্য কী?
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Declaring Deaf People’s Human Rights’। বাংলায় যার ভাবার্থ—‘বধির মানুষের মানবাধিকার ঘোষণা ও নিশ্চিতকরণ’।
এ বছরের প্রতিপাদ্যে শুধু অধিকার স্বীকার করাই নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বধির মানুষের মানবাধিকার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় ইশারা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা, তথ্য, সরকারি সেবা ও সামাজিক জীবনে পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইশারা ভাষা কি শুধু অঙ্গভঙ্গি?
অনেকের ধারণা, ইশারা ভাষা মূলত হাতের কিছু সংকেত বা অঙ্গভঙ্গির সমষ্টি। কিন্তু বাস্তবে ইশারা ভাষাগুলো পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক ভাষা। এগুলোর নিজস্ব ব্যাকরণ ও কাঠামো রয়েছে এবং এগুলো কথ্য ভাষা থেকে স্বতন্ত্র।
বিশ্বজুড়ে বধির মানুষরা ৩০০টিরও বেশি ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে যোগাযোগের জন্য ‘International Sign’ নামে একটি ব্যবস্থাও ব্যবহৃত হয়।
কেন ২৩ সেপ্টেম্বর?
দিনটি বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে ঐতিহাসিক কারণ। ১৯৫১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় World Federation of the Deaf (WFD)। বধির মানুষের অধিকার, ইশারা ভাষা ও বধির সংস্কৃতির স্বীকৃতি নিয়ে কাজ করে আসছে সংগঠনটি।
২০২৬ সালে WFD প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। একই বছর জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক কনভেনশন (CRPD) গ্রহণেরও ২০ বছর পূর্তি হচ্ছে। ফলে এবারের আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বিশ্বে কত মানুষ ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন?
World Federation of the Deaf-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৭ কোটির বেশি বধির মানুষ রয়েছেন। তাদের ৮০ শতাংশের বেশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বসবাস করেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য যোগাযোগ, শিক্ষা ও সরকারি সেবায় ইশারা ভাষার সুযোগ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘ বলছে, ছোটবেলা থেকেই ইশারা ভাষায় প্রবেশাধিকার এবং ইশারা ভাষাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা বধির শিশুদের বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে।
শুধু যোগাযোগ নয়, এটি অধিকার
ইশারা ভাষার সুযোগ না থাকলে একজন বধির মানুষের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা, সরকারি সেবা, বিচারব্যবস্থা কিংবা কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ অনেক কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই ইশারা ভাষার অধিকারকে শুধু যোগাযোগের সুবিধা হিসেবে না দেখে মানবাধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করার ওপর জোর দিচ্ছে জাতিসংঘ ও বধিরদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো।
জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক কনভেনশন ইশারা ভাষার ব্যবহারকে স্বীকৃতি দেয় এবং ইশারা ভাষা শেখার সুযোগ ও বধির সম্প্রদায়ের ভাষাগত পরিচয়কে সমর্থনের কথা বলে।
২১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ
আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবসের পাশাপাশি ২১ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে International Week of Deaf People বা আন্তর্জাতিক বধির সপ্তাহ। ২০২৬ সালের সপ্তাহটির মূল প্রতিপাদ্যও ‘Declaring Deaf People’s Human Rights’।
এ সপ্তাহে শিক্ষা, প্রবেশগম্যতা, বধির সংস্কৃতি, জাতীয় ইশারা ভাষার স্বীকৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বধির মানুষের অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয় সামনে আনা হচ্ছে।
ইশারার ভাষা হয়তো শব্দহীন, কিন্তু সেই ভাষার বার্তা স্পষ্ট—যোগাযোগের সুযোগ, শিক্ষা, মর্যাদা ও মানবাধিকার সবার জন্য সমান। আন্তর্জাতিক ইশারা ভাষা দিবস তাই শুধু একটি দিবস নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ার আহ্বান, যেখানে ভাষার ভিন্নতার কারণে কেউ অধিকার ও সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকবে না।
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: