আপনারা যে খালেদা জিয়ার দল, এই সম্মানটুকু রাখবেন: ফাহাম আব্দুস সালাম
রাত পোহালেই শপথ নেবেন নতুন সংসদ সদস্য ও নতুন মন্ত্রীসভার সদস্যরা। গণতান্ত্রিক এক বাংলাদেশের নতুন সূচনা হতে যাচ্ছে মঙ্গলবার। এর আগেই মির্জা ফখরুলের মেয়ে জামাই লেখক ও এক্টিভিস্ট ফাহাম আব্দুস সালাম এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক ও দলটির নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে।
নিজের ফেসবুক পেইজে সোমবার দেওয়া ওই দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তারেক রহমান ও বিএনপির নেতাকর্মীবৃন্দকে অভিনন্দন জানিয়ে ফাহাম লিখেছেন, বাংলাদেশের মানুষ আপনার ওপর ও আপনার দলের ওপর অভাবনীয় সমর্থন জানিয়েছে, যার ফলাফল আমরা দেখছি। খালেদা জিয়ার দলকে বাংলাদেশের মানুষের এই অভাবনীয় সমর্থনের একটা মূল কারণ: আপনিসহ এই দলের অগণিত নেতাকর্মীর অকল্পনীয় ত্যাগ ও দীর্ঘ ১৬ বছরের সংগ্রাম।
এরপর তিনি লিখেছেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সুপার মেজরিটি বেশিরভাগ সময়ে বিপদ হয়ে যায়। এই ভার নেওয়া আসলেই কঠিন। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। সময়টা উদযাপনের না। বিনয়ী হওয়ার দিন, মাথা নত করার দিন। গতকাল আপনি যে বিরোধী দলের নেতাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছেন - এই জেসচার ভালো লেগেছে, আশা জাগায়। এই ধরনের সভ্য আচরণ বাংলাদেশে নাই হয়ে গিয়েছিলো গত ১৬ বছর। ক্ষমতার উৎকট প্রকাশ আমাদেরকে ভয়ার্ত করে তোলে। আমরা বিশ্বাস করি যে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারি দল যদি একটু একোমোডেটিভ আচরণ করে - বহু সমস্যা চেয়ারে বসে সমাধান করা সম্ভব।
এরপর ফাহাম লিখেছেন, দয়া করে মনে রাখবেন যে বাংলাদেশের মানুষ আপনাদেরকে আগাম আস্থা প্রকাশ করেছে। এমন আস্থা জানিয়েছে যার অনেকটা আপনারা এখনো অর্জন করেন নাই। আগামী ৫ বছরে আপনাদেরকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনারা এর যোগ্য।আমি আশা করি ও দোয়া করি আপনি সফল হবেন।
বিরোধী দলের প্রশংসা করে লেখক বলেছেন, প্রথমেই বলি যে ক্যাম্পেইনার হিসাবে আপনি রেলেন্টলেস ও বিশ্রামহীন। এটি একটি বিশেষ সক্ষমতা। আমার কাছে খালেদা জিয়াই ছিলেন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড এবং আপনি সেটা স্পর্শ করতে পেরেছেন। কুডোস! অবশ্য বেগম জিয়ার অপোনেন্ট ছিলো ১টা ইতর। সেদিক থেকে আপনি সৌভাগ্যবান যে আপনার অপোনেন্ট অন্ততপক্ষে একজন ভদ্রলোক। এগেইন - আমি আপনার ক্যাম্পেইনিং দেখে আশ্চর্য হয়েছি।
দেশের স্থিতিশীলতা কামনা করে মির্জা ফখরুলের মেয়ের জামাই লিখেছেন, বাংলাদেশে আজকে স্ট্যাবিলিটি প্রয়োজন। সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজন আছে; কিন্তু আমাদের দেশের এতো সমস্যা যে সেদিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত। দয়া করে আপনারা আইডিয়ালিস্ট ও কোমল বিপ্লবীদের পাল্লায় পড়বেন না।
দেশের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে এই এক্টিভিস্ট লিখেছেন, সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো আমাদের যুবকরা কর্মহীন ও আনস্কিলড। যেভাবেই হোক, যেকোনো ছাড় দিয়েই হোক - বিনিয়োগ আনতে হবে, কর্মসংস্থান তৈরী করতে হবে, আমাদের ছেলেমেয়েদের আপস্কিল করতে হবে। আমাদের ব্যবসায়ীদের জন্য রেড-টেইপ কমাতে হবে। সরকারের টাকা নাই আর প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানো ছাড়া আমাদের তেমন কোনো রাস্তা নাই।
এরপর অনুরোধ জানিয়ে ফাহাম লিখেছেন, একটা কথা দয়া করে মনে রাখবেন। আপনাদের বিরোধীরা অনেক বিষয়েই আপনাদের নিয়ে অনেক মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করেছে। এটা সত্য। কিন্তু বিএনপির বিরুদ্ধে যে চাঁদাবাজির অভিযোগ সেটা পুরাপুরি মিথ্যা না। পার্সেপশান ম্যাটার্স এবং জনমানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে এই পার্সেপশান রয়েছে যে স্ট্রীট লেভেলে বিএনপির নীচের নেতাকর্মী প্রচুর চাঁদাবাজি করেছে গত ১৮ মাস। যদিও বিএনপি হাজার হাজার কর্মীকে বহিষ্কার করেছে - কিন্তু এটা এখন আর মোটেও যথেষ্ট না। এখন একশানের সময়। আমার অনুরোধ: আপনি এবং আপনাদের সরকার নিজের দলের নেতাকর্মীদের ওপর খড়গহস্ত হবেন - যদি তারা চাঁদাবাজি করে। সামনে আমাদের প্রচুর চ্যালেঞ্জ কিন্তু একটা জায়গায় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব ও অপেক্ষাকৃত সহজ। সেটা হলো ল এন্ড অর্ডার ঠিক করা।
ফ্যাস্টিস্ট হাসিনার পতনের পর দেশের কিছু জায়গায় যে মব হয়েছে সেটা বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, গত ১৮ মাসে যে মববাজি হয়েছে সেটা পুরাপুরি বন্ধ করতে হবে। রাস্তাঘাটে কেউ আইন হাতে তুলে নিলে তাকে আইনের ফুল ফোর্স ফেইস করতে হবে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার প্যারোডি করে ফাহাম লিখেছেন,
"মববাজি যে করে আর মববাজি যে সরকার সহে
তব ঘৃণা তারে যেন নেক্সট ইলেকশানে হারে।"
কোনো দাবী মানেই রাস্তা বন্ধ করে মিছিল বা অবস্থান - এই জনদুর্ভোগ কোনোভাবেই মানবেন না। ঢাকা শহরে রাস্তা বন্ধ করে রাজনৈতিক সমাবেশ এমন একটা লাক্সারি যেটা এই শহর এফোর্ড করে না। দাবীদাওয়া নিয়ে দেনদরবার হবে সিভিলাইজড ওয়ে তে - ঘরের ভেতর। কোনো দাবীর জন্য রাস্তাঘাট পরিহার করার মতো জায়গায় আমাদের আসা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
এরপর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে সাবেক এই বিতার্কিক লিখেছে, বাংলাদেশের হিন্দু কমিউনিটি গত ৮০ বছর ধরে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। এবার তারা একচ্ছত্র ভাবে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। আগামীবার হয়তো জামায়াত ও এনসিপিকেও ভোট দেবে। এই ঘটনাটা সিগনিফিকেন্ট। লীগের প্রতি হিন্দু কমিউনিটির যে মেন্টাল বন্ডেজ - এখান থেকে বের হওয়াটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য খুবই তাৎপর্যময় ঘটনা। একজন নাগরিকের তথা বিশাল একটা কমিউনিটির কখনোই এমন মনে করা উচিত না যে কেবল একটা দলই তাদের রেপ্রেজেন্ট করতে পারে। কিন্তু হিন্দু কমিউনিটির যে নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা এটা আপনাদেরকে ফুলফিল করতে হবে। আমার কাছে বরাবরই মনে হয়েছে যে দরিদ্র হিন্দুরা খুবই ভালনারেবল এই দেশে। এমন না যে অন্যান্য দেশের মাইনরিটির তুলনায় তাদের ফিজিকাল ডেঞ্জার অনেক বেশি (এ জায়গাটায় বাংলাদেশ আসলে বেশ ভালোই বলতে হবে) - কিন্তু দরিদ্র হিন্দুদের ঠকানো হয় - তাদেরকে আটকে দেওয়া হয়। কোনো মুসলামনকে একজন হিন্দু বা ক্রিশ্চান বা নাস্তিক, ট্রাস্ট করতে পারছে না আগেভাগে - এই আশংকা আমার কাছে এম্ব্যারাসিং লাগে। এই জায়গাটায় আপনাদের সরকারের অনেক যত্নশীল হতে হবে। মুসলমান হিসাবে এটা আমাদের একান্ত কর্তব্য। হিন্দু না, নাগরিক হিসাবেই তার নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করুন।
গণতন্ত্র ধরে রাখার কৌশল হিসেবে ফাহাম লিখেছেন, কোনো গণতন্ত্রে একটা বিশাল কমিউনিটির ~১০০% কনভার্সান একটা প্রায় অসম্ভব ঘটনা এবং এই বিরলতম ঘটনাটি বাংলাদেশে এইবার ঘটেছে। যেই অগ্রিম আস্থা তারা জানিয়েছে - আপনাদের অবশ্যই সেটা প্রমাণ করতে হবে। সরকারের মূল কর্তব্য হলো দুর্বলকে প্রোটেক্ট করা। সেই নিরীখে আরো একটা কথা বলতে হবে। বাংলাদেশের মেয়েদের চলাফেরার নিরাপত্তা দিতে হবে। মেয়েরা যেন সব জায়গায় পার্টিসিপেট করতে পারে। অনলাইনে তাদের আটকানোর জন্য যে গালিগালাজ করা হয় - সেই জায়গাটায় আপনাদের তৎপরতা আমরা দেখতে চাই।
এরপর ফাহামের লেখায় উঠে এসেছে দেশের শিক্ষাখাতের সংস্কারের অনুরোধ। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়ের দিক হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের ছেলেমেয়েরা ১৬ বছর স্কুল কলেজে গিয়েও পুরাপুরি অশিক্ষিত থাকতে পারে - এই বিচিত্রতম ঘটনা বাংলাদেশে অহরহ ঘটে। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অপরাধ চুরি-ডাকাতি না - একটা জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরাপুরি ধ্বংস করে ফেলা (বিশেষ করে বাংলা মিডিয়াম)। প্রাইমারি স্কুল থেকে সংস্কার শুরু করার পরিকল্পনা আপনাদের পুরাপুরি সঠিক। আগামী ৫ বছরে আপনারা যদি শুধুমাত্র শিক্ষাব্যবস্থার গ্রহণযোগ্য সংস্কার করতে পারেন - আমি বলবো যে আপনাদের সরকারকে পাশমার্ক দেওয়া যাবে।
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ফাহাম আব্দুস সালাম লিখেছেন, বাংলাদেশের আগের সরকারগুলোর একটা মূল লক্ষ্য ছিলো বিরোধী মত ও বিরোধী মতের মানুষকে সাইজ করা। দয়া করে এই রাস্তায় উঠবেন না। সবাইকে সাথে নিয়ে আমাদের চলতে হবে। বি ম্যাগনানিমাস। জাতি আপনার কাছে এই আশা করে। আর বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে এই আশা করে যেন আপনারা সুযোগ সুবিধা কুক্ষিগত না করেন। এই দুটো আকাঙ্ক্ষাকে এক বিন্দুতে আনার একটাই রাস্তা: আপনারা আইনের সামনে মাথা নত করেন। আইন মানুন ও আইন রক্ষা করুন। কিন্তু আইনি গন্ডির ভেতরে যতোটুকু সুবিধা দেওয়া যায় - তার পুরাটুকু বিরোধীদের দিন। বাংলাদেশ একটা ল্যান্ড অফ স্ক্যান্টি। এই দেশে যে ভাত শেয়ার করে না - তার চেয়ে বড়ো অপরাধী আর কেউ নাই (কিন্তু কেউ মুখে বলে না)। মানুষ কিন্তু এই বিষয়টা সবার আগে দেখে। কবি বলেছেন, "কেউ খাবে আর কেউ খাবে না - তা হবে না তা হবে না"
একদম শেষে তিনি আগামীর প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আশা ব্যক্ত করে লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রীত্ব এক অসহায় পদ। লক্ষ মানুষের ভিড়ে, পিঞ্জরে বাধা অসহায় এক একাকী মানুষ হয়ে ওঠার যাত্রা হলো - "প্রধানমন্ত্রী"। আপনার জন্য দোয়া করি যেন আল্লাহ আপনার সহায় হয় কারণ আর কেউ আপনার সত্যিকারের সহায় হবে না - লোভের হাতই এইদেশে মানুষ বাড়িয়ে দেয়। নির্বাচনে জেতা বিএনপি নেতাদের কাছে আমার অনুরোধ: মানুষের সমস্যা সমাধান করেন। বি হাম্বল। যে অকল্পনীয় সমর্থন বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের দিয়েছে - তার মর্যাদা রাখুন। আশা করি আপনারা যে খালেদা জিয়ার দল - এই সম্মানটুকু রাখবেন।
বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: