২০ বছর আগে চুরি হওয়া চিত্রকর্ম যেভাবে উদ্ধার করলো এআই
ইতালিতে ২০ বছর আগে চুরি হওয়া সাধু অ্যাগনেসের একটি চিত্রকর্ম উদ্ধার করেছে পুলিশ। চুরির পর ছবিটির মূল অবয়ব পরিবর্তন করে আড়াল করার চেষ্টা করা হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তায় সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। শুধু এই চিত্রকর্মই নয়, এআইয়ের সাহায্যে শত শত মূল্যবান চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য উদ্ধারে সফল হয়েছে ইতালির পুলিশ।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইতালির পারমা শহরে একটি প্রাচীন শিল্পবস্তুর মেলায় নিয়মিত পরিদর্শনে যান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত পুলিশের সদস্যরা। মেলায় প্রদর্শিত বিভিন্ন শিল্পকর্মের ছবি তুলে সেগুলো পুলিশের নিজস্ব ডেটাবেজে যুক্ত করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি ছবিতে সন্দেহজনক মিল শনাক্ত করে এআই ব্যবস্থা। ছবিতে ফিরোজা ও লাল পোশাক পরা এক তরুণীকে হাতে একটি আংশিক খোলা পার্চমেন্টসহ দেখা যাচ্ছিল।
পরদিন পুলিশ চিত্রকর্মটি জব্দ করে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করায়। পরে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট ইতালির নেপলসের কাছে সুলমোনা এলাকার ভার্গো পোটেন্স গির্জা থেকে চুরি হওয়া ১৭ শতকের সাধু অ্যাগনেসের চিত্রকর্ম। প্রায় এক মিটার উঁচু ছবিটি চুরির পর এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল, যাতে সহজে শনাক্ত করা না যায়।
মূল ছবিতে সাধু অ্যাগনেসের হাতে ছিল একটি সাদা মেষশাবক ও একটি পাম শাখা। কিন্তু চুরির পর মেষশাবককে পার্চমেন্টের মতো দেখানো হয় এবং মাথার পেছনের বলয় ও পাম শাখা মুছে ফেলা হয়। ফলে ছবির নারীকে সাধারণ এক তরুণী বলে মনে হচ্ছিল। এআই ছবির রং, নকশা ও অন্যান্য দৃশ্যগত বৈশিষ্ট্যের মিল শনাক্ত করে সেটিকে চুরি হওয়া চিত্রকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করে।
ইতালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা পুলিশের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালভাতোর রাপিচাভোলি জানান, এআই প্রযুক্তি এমন কিছু সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে পারে, যা মানুষের চোখে সহজে ধরা পড়ে না।
চুরি হওয়া শিল্পকর্ম শনাক্তে ইতালির পুলিশ ১৯৬৯ সাল থেকে একটি ডেটাবেজ সংরক্ষণ করছে। এতে প্রাচীন মুদ্রা, ভাস্কর্য, পাণ্ডুলিপি, ধর্মীয় নিদর্শন ও চিত্রকর্মসহ ১০ লাখের বেশি নিদর্শনের তথ্য রয়েছে।

২০২০ সালে পুলিশের দল ‘স্টোলেন ওয়ার্কস অব আর্ট ডিটেকশন সিস্টেম’ (সোয়াডস) নামের এআই ব্যবস্থা তৈরি করে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এটি ব্যবহারের পর থেকে প্রযুক্তিটির সহায়তায় ৩০০টির বেশি বড় চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য এবং ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি ছোট নিদর্শন উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা এসব নিদর্শনের মোট মূল্য ২০ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ইউনিট।
এআই ব্যবস্থাটি পুলিশের ডেটাবেজে থাকা ছবির সঙ্গে মেলানোর পাশাপাশি অনলাইন নিলাম, ই-কমার্স সাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত শিল্পকর্মের ছবিও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। ২০২৬ সালে ইতালির তুরিনে এই প্রযুক্তির সহায়তায় ফিলিপ্পো পালিজ্জির আঁকা ‘রিপোসো ডেলা পাস্তোরেলা’ নামের একটি চিত্রকর্ম উদ্ধার করা হয়। ১৯৭২ সালে একটি আধুনিক শিল্পকলা গ্যালারি থেকে চুরি হওয়া ছবিটি পরে একটি নিলাম প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকর্ম চুরি শনাক্তে এআই গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হলেও এটি তদন্তকারীদের বিকল্প নয়। প্রযুক্তিটি মূলত কোনো ছবি চুরি হওয়া শিল্পকর্মের ডেটাবেজে থাকা ছবির সঙ্গে মেলে কি না, তা শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু চোরকে শনাক্ত করা, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দায়িত্ব মানুষেরই।
আর্ট রিকগনিশন প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা কারিনা পোপোভিচ বলেন, এআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিল্পকর্ম উদ্ধার করতে তদন্ত এবং বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন।
নিম্নমানের ছবি, অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ-তথ্য এবং ত্রিমাত্রিক বস্তু শনাক্তের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একই শিল্পকর্মের একাধিক অনুলিপি থাকলে আসল ও নকলের পার্থক্য নির্ধারণ করাও কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অপরাধীরাও এআই ব্যবহার করে শিল্পকর্মের ছবি পরিবর্তন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ডিজিটালভাবে মেরামত কিংবা জাল মালিকানার নথি তৈরি করতে পারে। ফলে প্রযুক্তিটি যেমন তদন্ত সহজ করছে, তেমনি অপরাধীদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
ইতালির পুলিশ ২০২৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন দেশের শিল্পকর্ম শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। তুরস্ক, ফ্রান্স ও জার্মানিতেও চুরি হওয়া শিল্পকর্ম শনাক্তে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরাও চুরি হওয়া ভাস্কর্য ও নাৎসি বাহিনীর লুট করা শিল্পকর্মের ইতিহাস শনাক্তে এআই নিয়ে কাজ করছেন।
আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের ‘আইডি-আর্ট’ ব্যবস্থাও বিভিন্ন দেশের ডেটাবেজের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্পেনের পুলিশ ১৯৭৯ সালের ঝাপসা সাদাকালো ছবির সঙ্গে মিলিয়ে ৪০ বছরেরও বেশি আগে চুরি হওয়া রেনেসাঁ যুগের দুটি টেবিল উদ্ধার করেছে। একইভাবে উদ্ধার করা হয়েছে রোমান সাম্রাজ্য আমলের তিনটি স্বর্ণমুদ্রা, যেগুলোর মূল্য ২ লাখ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি চুরি হওয়া বা বহুল আলোচিত শিল্পকর্ম উদ্ধারে এআইয়ের কার্যকারিতা তুলনামূলক কম হতে পারে। কারণ, এসব শিল্পকর্মের চোরেরা সাধারণত প্রচলিত বাজারে বিক্রির চেষ্টা না করে গোপন সংগ্রহশালা বা নিরাপদ সংরক্ষণাগারে লুকিয়ে রাখে।
সূত্র: বিবিসি
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: