ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ধসে পড়বে বিশ্ব-অর্থনীতি, সংকটে বাংলাদেশও
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৬ মার্চ বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৩ ডলার ছাড়িয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই বৃদ্ধিত হার প্রায় ৩৪ শতাংশ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যানশিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ২০২৩ সালের পর আন্তর্জাতিক বাজারে এটাই অপরিশোধিত তেলের সর্বোচ্চ দাম।
জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক হোর্হে লিওন এই পরিস্থিতিকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বিপর্যয়কর ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এটি এমন এক সন্ধিক্ষণ, যখন বোঝা যাচ্ছে না এটি কি সাময়িক সংকট নাকি বিশাল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শুরু। যদি সরবরাহ ব্যবস্থা দুই সপ্তাহের বেশি বন্ধ থাকে, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চার সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন করে অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে ইইউ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এরই মাঝে ওই অঞ্চলে হুহু করে বাড়ছে জ্বালানির মূল্য। ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে কয়েক সপ্তাহের তেল মজুত আছে, কিন্তু সেই মজুত ফুরিয়ে গেলে এবং উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজার সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি আসপেক্টস–এর প্রতিষ্ঠাতা অম্রিতা সেন বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তেলের দাম অল্প সময়ের জন্য ১২৮ ডলার পর্যন্ত উঠলেও পরে দ্রুত কমে যায়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার অন্তত প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম তিন অঙ্কে পৌঁছে যেতে পারে। কারো কারো মতে, এটি এখন অনিবার্য।
এরই মাঝে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্কতা জানিয়ে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে। সাদ আল-কাবি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় ইরান সংলগ্ন হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধের জেরে এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো, যারা অপরিশোধিত তেলের জন্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল, তারা চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
কেবল এসব দেশ নয়, উদ্ভূত বাস্তবতায় সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশও। এরই মাঝে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বমহলে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও নানা ভাবে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।
ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। ইরান যুদ্ধের আবহে এরই মাঝে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি নিতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে। এরপরও অনেক জায়গায় জ্বালানি মিলছে না।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত দুই সপ্তাহের নিচে নেমেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি। পরিস্থিতি সামাল দিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে পরিশোধিত তেল আমদানির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, বিশ্ববাজারের চলমান এই অস্থিরতা বাংলাদেশের সামনে একটি বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা আকারে হাজির হতে পারে।
বিভি/এইচজে



মন্তব্য করুন: