জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা, মিললো প্রমাণ
ছবি: বিবিসি
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনেরও ভূমিকা ছিল বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণাটি বলছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, হিমবাহ পাতলা হয়ে যাওয়া, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া এবং আগে থেকেই বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতার সম্মিলিত প্রভাবে হিমবাহ ধসে এই বিপর্যয় ঘটে।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ) প্রকাশিত গবেষণাটি বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, এই দুর্যোগ ছিল একটি ‘সম্মিলিত ঘটনা’, যার পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।
গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী শহর ও গ্রামগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ভেসে যায়, জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন হাজারো মানুষ।
গবেষণার অন্যতম লেখক ও লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিদ ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, এই দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতিমূলক পরিস্থিতি তৈরিতে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল—এ নিয়ে ‘একেবারেই কোনো সন্দেহ নেই’।
বিজ্ঞানীরা এর আগে জানিয়েছিলেন, হিমালয়ের নেপাল অংশে লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে একটি হিমবাহের ঢাল ধসে পড়ার পরই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়। হিমবাহের বিশাল একটি অংশ এত প্রবল শক্তিতে উপত্যকার নিচে আছড়ে পড়ে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, এর কম্পন ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ছিল ‘আগে থেকেই বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতার ওপর কাজ করা একটি অস্থিতিশীলকারী উপাদান’। তবে এটিই দুর্যোগের একমাত্র কারণ নয়।
গবেষণা অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ওই অঞ্চলে জুলাই ও আগস্টের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। একই সময়ে হিমবাহগুলো বছরে প্রায় আধা মিটার করে পাতলা হয়ে যাচ্ছিল। এতে বিদ্যমান ফাটল দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি হিমবাহের অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে হওয়া ভারী তুষারপাত চলতি বছরের শুরুতে বিপুল পরিমাণ গলিত পানির সৃষ্টি করে। গবেষকদের মতে, এসব কারণ একে অপরের সঙ্গে মিলে দুর্যোগের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ওই অঞ্চলে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পও পর্বতের অভ্যন্তরীণ শিলাস্তর দুর্বল করে থাকতে পারে। ওই ভূমিকম্পের পর সেখানে শিলা ও বরফের ধসও হয়েছিল। তবে গত মাসের হিমবাহ ধসে ওই ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট প্রভাব কতটা ছিল, তা নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
গবেষণার আরেক লেখক ও ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বত জলবিদ্যাবিদ ওয়াল্টার ইমারজেল বলেন, এলাকাটি ‘ভূতাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ একটি ঢাল’। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে এটি দুর্বল হয়ে থাকতে পারে এবং পরে হিমবাহ ও পারমাফ্রস্ট সরে যাওয়ার কারণে আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
দুর্যোগের পর নেপাল সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির দাবি, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান খুবই কম হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে বালেন্দ্র শাহর। সেখানে তিনি সাম্প্রতিক এই দুর্যোগ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়টি তুলে ধরবেন।
সূত্র: বিবিসি
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: