দেশ ছেড়েও মেলেনি স্বস্তি, খালি হাতেই ভিটামাটিতে ফিরছেন লাখো আফগান
সুন্দর জীবনের আশায় তারা আফগানিস্তান থেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইরানে। তবে যে স্বপ্নের খোঁজে তারা দেশ ছেড়েছিলেন, সেই দেশে ফিরেও মেলেনি কোনো স্বস্তি। ইরানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে নিজ দেশে ফিরছেন আফগান শরণার্থীরা।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রভাবে ইরানে কর্মসংস্থানে ধ্বস নেমেছে। সেই সাথে অবৈধ ও বৈধ উভয় অভিবাসীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ এবং বহিষ্কার অভিযান জোরদার করেছে তেহরান। ফলে কোনো সম্পদ, জমানো টাকা বা কর্মসংস্থানের ন্যূনতম সুযোগ ছাড়া একদম খালি হাতে আফগানিস্তানে ফিরে আসছেন হাজার হাজার আফগান শরণার্থী।
বহু আফগান পরিবার কয়েক দশকের জমানো সংসার ও সম্পদ ইরানে ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। সীমান্ত পার হওয়ার সময় অধিকাংশের পকেটে নেই যাতায়াত বা খাবারের জন্য ন্যূনতম অর্থ। ১৭ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে সীমান্ত জুড়ে তৈরি হওয়া এই চরম ও হৃদয়বিদারক মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়।
হেলাত ও কান্দাহারের সীমান্ত ট্রানজিট ক্যাম্পগুলোতে তাবু, খাদ্য, সুপেয় পানি ও মৌলিক চিকিৎসার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শীতের আগমনে ও ত্রাণ সংস্থাগুলোর তহবিল ঘাটতিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
আফগানিস্তানে ফিরে আসা ব্যক্তি আব্দুল জব্বার বলেন, ''সত্যি বলতে, আমি আসলে আফগানিস্তানে ফিরে আসতে চাইনি। কোনো অবস্থাতেই আমি এখানে আসতে চাইনি। আমি বলতাম যে, আফগানিস্তান যদি মাত্র দুই রাস্তা দূরেও হতো, তবুও আমি সেখানে যাবো না। সেই সময় আমার সিদ্ধান্ত সেটাই ছিল। কিন্তু যখন যুদ্ধ শুরু হলো এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল, তখন আমি ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। এখানকার পরিচিত কয়েকজনও আমাদের বলছিল, ফিরে এসো, এখানে নিরাপত্তা বেশি এবং কাজের ভালো সুযোগ আছে। কিন্তু এখন এখানে এসে দেখছি কোনো কাজই নেই। আফগানিস্তানের অবস্থা আরও খারাপ। এখানে হয়তো আমরা না খেয়েই মারা যাব। না খেয়ে মরার চেয়ে যুদ্ধে মরাও ভালো।''
আব্দুল জাব্বারের মেয়ে সেতায়েশ বলেন, ''যদি পারতাম, তবে পড়াশোনা, বন্ধু-বান্ধব এবং স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আমি ইরানে ফিরে যেতাম। ইরানের জীবন অনেক ভালো ছিল। এখানে আমাদের অর্থের খুব টানাটানি। ইরানে আমাদের হাতে আরও বেশি টাকা ছিল। এই বাড়িটির তুলনায় আমাদের আগের বাড়িটি অনেক ভালো ছিল। বিদ্যুৎ ও পানির সুবিধার দিক থেকেও আমরা সেখানে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলাম। সেখানে বাইরে বের হওয়াও অনেক সহজ ছিল। কিন্তু এখানে আমার নিজেকে অনেক আবদ্ধ মনে হচ্ছে।''
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ আফগান শরণার্থী ইরান থেকে আফগানিস্তানে ফিরে এসেছেন। দীর্ঘদিনের সংকট ও আন্তর্জাতিক সহায়তার অভাবে আফগানিস্তানের অর্থনীতি এমনিতেই জরাজীর্ণ। নতুন করে এই বিপুল পরিমাণ নিঃস্ব মানুষের আগমন দেশটির বেকারত্ব ও দারিদ্র্যকে বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে।
প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে পুরোপুরি নিঃস্ব অবস্থায় আফগানিস্তানে ঢুকছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, বিপুল সংখ্যক এই নিঃস্ব জনগোষ্ঠীর দ্রুত টেকসই পুনর্বাসন ও আন্তর্জাতিক সাহায্য নিশ্চিত করা না গেলে আফগানিস্তানে নতুন করে এক ধ্বংসাত্মক মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
বিভি/এমএফআর













মন্তব্য করুন: