• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লাল গালিচায় অভ্যর্থনা, উষ্ণ সংবর্ধনা; তবুও পূরণ হলো না সব চাওয়া

প্রকাশিত: ১৪:১০, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৪:১২, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
লাল গালিচায় অভ্যর্থনা, উষ্ণ সংবর্ধনা; তবুও পূরণ হলো না সব চাওয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলেও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফর পুরোপুরি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। দুই দেশের বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য থাকায় বৈঠক থেকে বেইজিং তার সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হলো চীনের পরাশক্তি হিসেবে উত্থানের পথে যুক্তরাষ্ট্রের বাধা কমানো। বেইজিংয়ের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র চীনের উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটন যেন চীনের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়- এটাই বেইজিংয়ের অন্যতম প্রত্যাশা।

তবে এবার ট্রাম্প শিকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিলেও সব বিষয়ে চীনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা কমাতে যে সাময়িক সমঝোতা হয়েছিল, তার মেয়াদ আরও কয়েক মাস বাড়ানো হয়েছে। নভেম্বর থেকে তা জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হলেও বেইজিং অন্তত এক বছরের জন্য এই সমঝোতা চেয়েছিল। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের বাকি সময়টা তুলনামূলক স্থিতিশীলভাবে পার করার লক্ষ্যেই এমন প্রত্যাশা ছিল চীনের।

এর ফলে শুল্ক, বিরল খনিজ সরবরাহে চীনের আধিপত্য এবং উন্নত মার্কিন চিপে চীনের প্রবেশাধিকার—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিরোধ আবারও পরবর্তী দফার আলোচনার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এতে ইঙ্গিত মিলছে, দীর্ঘমেয়াদি ছাড় দেওয়ার আগে চীনের কাছ থেকে নিজেদের চুক্তির অংশ আরও বেশি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

শির জন্য অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। চীন রেকর্ড পরিমাণ পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করলেও দেশের অভ্যন্তরে ভোক্তাদের ব্যয় কমেছে। তরুণদের বেকারত্বও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে আবাসন খাতের মূল্য কমেছে। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ নিজস্ব বাড়ির মালিক হওয়ায় আবাসন বাজারের এই দুর্বলতা অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চীনের রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার চীনের জন্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা কঠোর শুল্কের মতো পদক্ষেপ থেকে নিজেদের রপ্তানি সুরক্ষিত রাখাই শির অন্যতম লক্ষ্য।

তাইওয়ান ইস্যুতেও শি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি চীনের জন্য একটি ‘রেড লাইন’। স্বশাসিত দ্বীপটির আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আইনগতভাবে সহায়তা দিতে বাধ্য।

গত মে মাসে শি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে মোকাবিলা করা হলে দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে। এরপর ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন পিছিয়ে দেন এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় এটিকে ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

বৈঠকে শি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন সমর্থন সীমিত রাখলে সংঘাতের ঝুঁকি কমবে—এমন যুক্তি তুলে ধরে থাকতে পারেন। বৃহস্পতিবারও তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র ‘সঠিক অবস্থান’ বজায় রাখবে।

তবে তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন সমর্থন অব্যাহত রাখার জন্য দুই দলেরই কিছু আইনপ্রণেতার চাপের মুখে থাকা ট্রাম্প এখনো শির এই বক্তব্যের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

দুই নেতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও আলোচনা করেছেন। তবে প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তারা একমত হয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেই এই আলোচনা হয়েছে। অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে প্রযুক্তিটিকে আরও নিরাপদ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে একই প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ নিরাপত্তা গবেষক সতর্ক করে বলেছিলেন, এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কা ১০ শতাংশেরও বেশি।

তবে বৈঠকে শি শুধু এআই যেন ‘সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে’—এর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এর বাইরে বড় কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। অন্যদিকে ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কাকে ‘ভিত্তিহীন প্রচারণা’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন।

এবারের বৈঠকের আলোচনায় অবশ্য পান্ডার কথাও এসেছে। আটলান্টায় চীনের উপহার হিসেবে দেওয়া ‘পিং পিং’ ও ‘ফু শুয়াং’-এর আগমন নিয়ে এপ্রিলে প্রথম ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এবার শি জানিয়েছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই তারা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে। এর মাধ্যমে চীনের বহুল আলোচিত ‘পান্ডা কূটনীতি’ আবারও সক্রিয় হচ্ছে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুই নেতা চা পান এবং জাতীয় আর্কাইভ পরিদর্শন করবেন। এ সময় আরও কিছু ঘোষণা আসতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বেইজিংয়ের জন্য সম্মেলনের বড় অর্জনগুলোর একটি হতে পারে এর দৃশ্যমান দিক বা রাজনৈতিক বার্তা। বিমানবন্দরে ব্যক্তিগতভাবে শিকে স্বাগত জানানো, জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রীয় ভোজে তিলের আবরণযুক্ত সামুদ্রিক মাছ ও ব্রেইজড বেবি বক চয় পরিবেশন—সব মিলিয়ে চীনে এ সফরের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এতে ট্রাম্পের সমকক্ষ হিসেবে শির ভাবমূর্তি আরও দৃঢ় হয়েছে বলে চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

দুই নেতাকে তুলনা করে বিভিন্ন মিমও চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একটি জনপ্রিয় ছবিতে দেখা যায়, ওপর দিয়ে বোমারু বিমান উড়লেও ট্রাম্পকে অস্বস্তিতে দেখা যাচ্ছে, আর শি রয়েছেন নির্বিকার।

বিশ্বের অন্যতম অনিশ্চিত রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সম্পর্ক সামলানোর একটি কৌশল শি জিনপিং খুঁজে পেয়েছেন—এমন ধারণা তৈরি হলেও তার দৃষ্টি আরও বড় লক্ষ্যে। ট্রাম্প যেখানে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘সত্যিকারের মহান বন্ধুত্ব’ হিসেবে তুলে ধরছেন, সেখানে শির মূল মনোযোগ যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনের পরাশক্তি হিসেবে অবস্থান নিশ্চিত করার দিকে।

পান্ডা, জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন আর উষ্ণ কথাবার্তা দুই দেশের সম্পর্ককে কিছুটা মসৃণ করতে পারে। তবে এসব আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে বিশ্বের দুই শক্তিশালী দেশের প্রতিযোগিতা এখনো তীব্রই রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত