গার্ডিয়ান এক্সক্লুসিভ
কোকেনে বেসামাল যুক্তরাজ্য, বাড়ছে অপরাধ!
ছবি: গার্ডিয়ান
যুক্তরাজ্যে কোকেনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধও। হামলা, পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ থেকে শুরু করে মাদক সেবন করে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানোর মতো অপরাধে উঠে আসছে কোকেনের সংশ্লিষ্টতা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় যুক্তরাজ্যে কোকেনসংশ্লিষ্ট অপরাধের হার বেড়েছে ১০ শতাংশ। একই সময়ে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় মাদকটির ব্যবহার বেড়েছে ২৬ শতাংশ।
কোকেন অত্যন্ত শক্তিশালী ও আসক্তি সৃষ্টিকারী উদ্দীপক মাদক। এটি সেবনের ফলে উচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, অস্থিরতা ও সন্দেহপ্রবণতা তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এ মাদক, যা সহিংস ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোকেনের ব্যবহার বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে মাদকটির তুলনামূলক কম দাম এবং উচ্চ বিশুদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
বর্জ্য পানির নমুনা বিশ্লেষণ করে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে ইংল্যান্ডের মানুষ আনুমানিক ১ লাখ ২৩ হাজার কেজি কোকেন সেবন করেছে। এই পরিমাণ কোকেনের সম্ভাব্য খুচরা বাজারমূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন পাউন্ড।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কোকেন শব্দটি উল্লেখ রয়েছে- এমন অন্তত ২৯ হাজার ৯২২টি অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। প্রতি এক লাখ মানুষের হিসাবে এই সংখ্যা ৬৩ দশমিক ৪। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫৭ দশমিক ৭।
চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে এ ধরনের অপরাধের হার বেড়ে প্রায় ৬৪-তে পৌঁছাতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাত বছরে বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ১০ শতাংশের বেশি।
স্কটল্যান্ডে ২৮ বছর পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা লেখক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ বিশেষজ্ঞ মার্টিন গ্যালাঘার বলেন, কোকেন সেবন এখন সমাজে অনেকটাই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
তার ভাষায়, “একসময় এটি ছিল সমাজের অভিজাত শ্রেণির মাদক। এখন স্থানীয় কোনো পানশালার শৌচাগারের ট্যাংকের ওপর থেকেও এটি পাওয়া যায়।”
গত বছর কোকেনসংশ্লিষ্ট অপরাধগুলোর বেশির ভাগই ছিল মাদকসংক্রান্ত অপরাধ। তবে ১৮ শতাংশ ছিল সহিংস অপরাধ। এসব ঘটনার মধ্যে অনুসরণ করে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও রয়েছে।
এ ছাড়া যেসব অপরাধের প্রতিবেদনে কোকেন শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে, তার প্রায় ৪ শতাংশ ছিল যৌন অপরাধ। এর মধ্যে ৩৪৪টি ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে।
তবে কোনো অপরাধের নথিতে কোকেনের উল্লেখ থাকলেই যে মাদকটি ওই অপরাধের কারণ, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় কোকেনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও আলাদা পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতার সন্দেহে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ওপর পুলিশের চালানো মাদক পরীক্ষায় প্রতি ১০ জনের প্রায় ছয়জনের শরীরে কোকেনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
তবে এসব তথ্য সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রতিনিধিত্ব করে না। কারণ, কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ আগে থেকেই মাদক সেবনের সন্দেহ করায় পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।
২০২৩ সালে পরিচালিত একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায়ও পারিবারিক সহিংসতার সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯ শতাংশের শরীরে কোকেন অথবা ওপিওয়েডজাতীয় মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
লিভারপুল জন মুরস বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদক ব্যবহারবিষয়ক অধ্যাপক হ্যারি সামনল বলেন, বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় কোকেন সরাসরি সহিংস আচরণ সৃষ্টি করে- এমন জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে পারিবারিক সহিংসতার পেছনে প্রায়ই ক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়টি কাজ করে।
তার মতে, কোকেনের প্রভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানো ও ঈর্ষা বেড়ে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠতে পারে। এতে আগে থেকে চলা নির্যাতন আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে এবং এর তীব্রতাও বাড়তে পারে।
সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা আইএএম রোডস্মার্টের পাওয়া ড্রাইভার অ্যান্ড ভেহিকল লাইসেন্সিং এজেন্সির (ডিভিএলএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো মাদক সেবন করে গাড়ি চালানোর অপরাধের সংখ্যা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধকে ছাড়িয়ে গেছে।
ওই বছর চালকদের লাইসেন্সে মাদক সেবন করে গাড়ি চালানোর ৩০ হাজার ৭০৭টি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে ২৯ হাজার ৭৬৯টি, যা ২০২২ সালের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম।
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অবৈধ মাদকগুলোর মধ্যে কোকেন ও গাঁজা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
ব্রিটিশ মোটরচালক সংগঠন আরএসি-এর পাওয়া তথ্য বলছে, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো ব্যক্তিদের তুলনায় মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো ব্যক্তিদের একই অপরাধ আবার করার প্রবণতা বেশি। ফলে অল্পসংখ্যক পুনরাবৃত্ত অপরাধীর কারণেও মাদক সেবন করে গাড়ি চালানোর মোট ঘটনা বেড়ে যেতে পারে।
ন্যাশনাল পুলিশ চিফস কাউন্সিলের মাদকবিষয়ক উপপ্রধান পল কোর্ট সতর্ক করে বলেছেন, অবৈধ মাদকের চাহিদা এমন একটি অত্যন্ত লাভজনক অপরাধী বাজারকে টিকিয়ে রাখছে, যার ভিত্তি সহিংসতা, শোষণ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন।
তার মতে, শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
গত বছর মাদক অপব্যবহারবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের এক স্বাধীন প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে নির্দিষ্ট অর্থায়নসহ সমন্বিত মাদক প্রতিরোধ কৌশলের ঘাটতি রয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক প্রতিরোধে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি কার্যকর হতে পারে।
পল কোর্ট বলেন, মাদকের চাহিদা কমানো, মানুষকে শুরুতেই মাদক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে বিরত রাখা, মাদকের ক্ষতি কমানো এবং মাদকনির্ভরতার সঙ্গে অপরাধপ্রবণতা বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় দ্য গার্ডিয়ান যুক্তরাজ্যের ৪৫টি পুলিশ বাহিনীর কাছে কোকেন শব্দটি উল্লেখ থাকা অপরাধের পরিসংখ্যান চেয়েছিল। এর মধ্যে ৩৯টি বাহিনী তথ্য দিয়েছে। তবে সব বাহিনীর কাছে প্রতিটি বছরের তথ্য কিংবা কোকেনসংশ্লিষ্ট অপরাধের ধরনভিত্তিক হিসাব ছিল না। লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
পুলিশের সংক্ষিপ্ত নোটে নির্দিষ্ট শব্দ অনুসন্ধান করে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে নথিতে কোকেনের উল্লেখ থাকলেই যে অপরাধটির সঙ্গে মাদকটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সাক্ষী যদি বলেন যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোকেন সেবন করেন, তাহলেও সেই অপরাধের নথিতে কোকেন শব্দটি থাকতে পারে।
অন্যদিকে, কোকেনের বানান ভুল থাকলে কিংবা নথির অন্য অংশে শব্দটি উল্লেখ করা হলে কিছু ঘটনা এই হিসাবের বাইরে থেকে যেতে পারে।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: