প্রাক্তনকে ভুলতে পারছেন না? বিশেষজ্ঞের ১ মাসের হিলিং প্ল্যান

জন্ম থেকেই জীবনের মোড়ে মোড়ে নানান সম্পর্কে জড়ায় মানুষ। এর মধ্যে রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও নারী-পুরুষের মধ্যে অদ্ভুতভাবে গড়ে উঠে ভালোবাসার সম্পর্ক। মায়ার বন্ধনে গড়ে ওঠা এই সম্পর্কেই অতিবাহিত হয় জীবনের দীর্ঘাংশ। এই পৃথিবীতে ভালোবাসায় আবদ্ধ হওয়া যেমন সত্য, তেমনি বিচ্ছেদও। কখনও কখনও একসঙ্গে বুড়ো হওয়ার স্বপ্নও ফিকে হয়, আলাদা হয় পথ। তবে, ভালোবাসা হারালেও থেকে যায় হাজারো স্মৃতি। ওই মানুষটির সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, স্বপ্ন, অভ্যাস আর আবেগগুলো তৈরি করে গভীর ক্ষত।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিচ্ছেদের পরও বারবার সেই মানুষটির কথাই ভাবছেন। এটি খুবই স্বাভাবিক একটি মানসিক প্রতিক্রিয়া বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে, দীর্ঘদিন ধরে প্রাক্তনকে ভুলতে না পারা মানসিক যন্ত্রণা বাড়ায়। একইসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রাক্তনের স্মৃতি হাতড়ে না বেড়িয়ে নতুনভাবে শুরু করার কিছু টিপস দিয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুবাইয়াৎ ফেরদৌস। ৩০ দিনে মানসিক স্বাস্থ্য সুস্থ করার দারুণ পরিকল্পনা অর্থাৎ হিলিং প্ল্যান দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। সাইকোলজিক্যাল এসব টিপসে ধীরে ধীরে আবেগীয় জটিলতা থেকে মিলবে মুক্তি।
প্রথম সপ্তাহ: স্বীকারোক্তি ও ডিটক্স
লক্ষ্য: বাস্তবতা মেনে নেওয়া, আবেগকে বের হতে দেওয়া।
দিন-১ ও ২: কাঁদতে চাইলে কাঁদুন। এই সম্পর্ক ভাঙার আসল কারণগুলো কী ছিল- তা লিখে ফেলুন।
দিন-৩: মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে প্রাক্তনের ছবি, মেসেজ, নম্বর মুছে ফেলুন বা হাইড করুন। যোগাযোগ বন্ধ করুন।
দিন-৪ ও ৫: প্রাক্তনের ভালো ও খারাপ দিকগুলো লিখুন। খারাপ দিকগুলো বারবার পড়ুন। এই সম্পর্ক ভাঙার কারণ মনে করুন।
দিন-৬ ও ৭: দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন। এতে শরীরের এন্ডরফিন মুড উন্নত হবে।
দ্বিতীয় সপ্তাহ: নতুন রুটিন তৈরি
লক্ষ্য: পুরোনো অভ্যাস ভেঙে নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হোন।
দিন-৮: প্রতিদিন সকালে ১০ মিনিট মেডিটেশন/যোগব্যায়াম শুরু করুন।
দিন-৯: নতুন কোনো বই পড়া শুরু করুন। নিজেকে সমৃদ্ধ করতে অর্থাৎ মানসিক বা শারীরিক বিকাশে নতুন কোনো কোর্সে ভর্তি হতে পারেন।
দিন-১০: দৈনন্দিন রুটিনের যে সময়টাতে প্রাক্তনের সাথে যুক্ত থাকতেন সে সময়ে অন্য কিছু করুন। যেমন- এক্সারসাইজ, রান্না বা সৃজনশীল কোনো কাজ।
দিন-১১: নিজের জন্য ছোট্ট উপহার কিনুন। এটি সেল্ফ-কম্প্যাশন বা নিজের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের প্রতীক।
দিন-১২ ও ১৩: বন্ধুর সঙ্গে বাইরে ঘুরতে যান, গল্প করুন। সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন।
দিন-১৪: আপনার স্বপ্নের তালিকা তৈরি করুন। পরবর্তী ৬ মাসে কী কী অর্জন করতে চান, তা নিয়ে ভাবুন।
তৃতীয় সপ্তাহ: মানসিক শক্তি তৈরি
লক্ষ্য: চিন্তাভাবনার পরিবর্তন, পুনরায় মানসিক শক্তি অর্জন
দিন-১৫: আপনার মনে আসা নেগেটিভ চিন্তাগুলো লিখে ফেলুন, তারপর পাশে যুক্তিযুক্ত উত্তর লিখুন।
দিন-১৬ ও ১৭: জার্নাল থেরাপি নিতে পারেন। প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা লিখুন: ‘আজ আমি কী শিখলাম?’
দিন-১৮: চোখ বন্ধ করে ভিজ্যুয়ালাইজেশন করুন- আপনি ভারী ব্যাগ নামিয়ে সামনে এগোচ্ছেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন।
দিন-১৯: নতুন কোনো জায়গায় ভ্রমণ করুন। একটি ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে হলেও ঘুরে আসুন।
দিন-২০: নিজের পুরোনো সাফল্যের তালিকা তৈরি করুন। যাতে মনে হয়, আপনি যথেষ্ট সক্ষম। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
দিন-২১: নিজের ভবিষ্যতের ছবি আঁকুন বা কল্পনা করুন। অর্থাৎ, নিজেকে শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী, সুখী হিসেবে ভাবুন।
চতুর্থ সপ্তাহ: নতুন জীবন শুরু
লক্ষ্য: নিজের সাথে নতুন সম্পর্ক গড়া
দিন-২২: প্রতিদিন অন্তত ১টি কৃতজ্ঞতার বিষয় লিখুন।
দিন-২৩ ও ২৪: নতুন বন্ধুত্ব বা নেটওয়ার্কিং করুন।
দিন-২৫: নতুন হেয়ারস্টাইল, নতুন পোশাক বা নতুন কিছুতে নিজের লুক পরিবর্তন করুন।
দিন-২৬: ‘ভবিষ্যৎ স্বপ্নের ভিশন বোর্ড’ তৈরি করুন (ছবি বা কাগজে লিখে)।
দিন-২৭: এক দিনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া এড়িয়ে চলুন।
দিন-২৮: আপনার ছোট-বড় যেকোনো অর্জন বা সাফল্য উদযাপন করুন। বন্ধুর সঙ্গে বাইরে যান বা নিজের জন্য বিশেষ কিছু করুন।
দিন-২৯: জার্নাল থেরাপিতে প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা করে যা লিখেছেন তা পড়ে দেখুন। কী কী শিখলেন বা কষ্ট কতটা কমেছে, ভাবুন।
দিন-৩০: নিজের জন্য একটি অঙ্গীকার লিখুন- ‘আমি নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত’।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রুবাইয়াৎ ফেরদৌস বলেন, এই ৩০ দিন অতিবাহিত করার পর মানসিক যন্ত্রণা অনেকটাই কমে আসবে। এই হিলিং প্ল্যানের মাধ্যমে মন পরিষ্কার হবে এবং নতুন অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত হবেন বলেও আশা এই বিশেষজ্ঞের।
বিভি/টিটি
মন্তব্য করুন: