• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১০ ব্যবসায়ী সংগঠনের যৌথ বিবৃতি

চট্টগ্রাম বন্দরে নজিরবিহীন অচলাবস্থায় বিপন্ন অর্থনীতি

প্রকাশিত: ২১:৫৩, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ
চট্টগ্রাম বন্দরে নজিরবিহীন অচলাবস্থায় বিপন্ন অর্থনীতি

চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান লাগাতার কর্মবিরতি ও জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সৃষ্ট মহাবিপর্যয় নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দেশের শীর্ষ ৯ বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে বিটিএমএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

যৌথ বিবৃতিতে এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিটিটিএলএমইএ, বিজিএপিএমইএ এবং বিজিবিএ এর সভাপতিবৃন্দ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি একটি বিরল সংকট যা জাতীয় অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে বিবেচিত দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর সম্পূর্ন  অচল করে দেওয়া হচ্ছে। বন্দর এক দিন বন্ধ থাকা মানেই অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাকসহ সকল খাতের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় দেশ এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

তারা বলেন, একদিকে রপ্তানি খাতের কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে পারছে না, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় বন্দরে পড়ে আছে। এতে করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেওয়া 'ডেডলাইন' রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আমরা আশঙ্কা করছি, এই অবস্থা আর মাত্র কয়েক দিন স্থায়ী হলে বড় ধরনের ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে এবং বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে তাদের সোর্সিং সরিয়ে নেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

উল্লেখ্য যে, দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা হ্রাস, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে শিল্পগুলো বিপর্যয়ের সম্মুক্ষীন- উদ্যোক্তারা প্রানান্তকর সংগ্রাম করছেন ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে। এরই মধ্যে বন্দর অচলাবস্থার কারণে ভয়াবহ কনটেইনার জট সৃষ্টি হওয়ায়  ডেমারেজ চার্জ, পোর্ট চার্জ ও স্টোরেজ রেন্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে করে রপ্তানির জন্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক বানিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব রাখবে।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত ব্যয় আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের ওপরই পড়বে। সামনেই পবিত্র রমজান মাস। এখনই এই সংকট নিরসন না হলে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হবে, যার ফলে কৃত্রিম সংকটে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। এই জনভোগান্তির দায়ভার আমাদের সবাইকে বহন করতে হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বর্তমান সংকটের ফলে ব্যাংক ঋণ ও এলসি ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। শিপমেন্ট সময়মতো না হলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের দায় পরিশোধ করতে পারবেন না, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করবে। উল্লেখ্য যে বন্দরের বর্নিত অচল অবস্থার ফলে দেশের আমদানী রপ্তানী দারুনভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশে ভাবমূর্তি চরম ভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে দেশের আমদানী রপ্তানীর বিরুপ প্রভাব আমাদের সামগ্রীক অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবে নেতীবাচক প্রভাব যা আসন্ন রমজান ও ঈদের বাজারে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। প্রকারন্তরে এই সমস্যা আসন্ন নতুন সরকারের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। তাছাড়া বন্দরের কার্যক্রম সুষ্ঠ ও স্বাভাবিক না থাকায় আমদানী রপ্তানী কাজে নিয়োজিত আর্ন্তজাতিক রুটে চলাচলকৃত জাহাজ গুলো তাদের পরবর্তী গন্তব্যে গমনাগমনে দারুনভাবে বাধাগ্রস্থ হবে।

নেতৃবৃন্দ বর্তমান সরকারকে বিনীত আহবান জানিয়ে বলেন, “দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই মুহূর্তেই বিষয়টি সুরাহা করুন। এনসিটি ইজারা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে নতুন সরকার পুনরায় পর্যালোচনার সুযোগ রাখতে পারেন। কিন্তু তার জন্য বন্দর অচল রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”

একই সাথে বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, “আপনারা এই বন্দরের প্রাণ। আপনাদের দাবি-দাওয়া সরকারের কাছে পৌঁছানোর অধিকার আপনাদের আছে। তবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া মানে নিজের ঘরকে নিজেই বিপদে ফেলা। আমরা আপনাদের আহবান জানাই - দেশের অর্থনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই ব্যতিক্রমী অবস্থান থেকে সরে আসুন। নতুন সরকার আপনাদের দাবিগুলো পর্যালোচনার আশ্বাস দিলে বন্দর সচল করাই হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।”

আমরা বিশ্বাস করি, সরকার এবং আন্দোলনরত পক্ষগুলো দ্রুত আলোচনার টেবিলে বসে আজকেই একটি টেকসই সমাধান বের করবেন। অন্যথায় এই মহাবিপর্যয় থেকে উত্তরণ কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সভাপতিবৃন্দ:
ফজলে শামীম এহসান, সভাপতি, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ)
আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ), সভাপতি, বাংলদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)
কামরান তানভিরুর রহমান, সভাপতি, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)
তাসকীন আহমেদ, সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)
সেলিম রহমান, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)
মোহাম্মদ হাতেম, সভাপতি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)
শওকত আজিজ রাসেল, সভাপতি,বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)
মোঃ শাহরিয়ার, সভাপতি, বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ)
মো. আব্দুল হামিদ, সভাপতি, বাংলাদেশ গার্মেন্টস বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশন (বিজিবিএ)
এম শাহাদাত হোসেন, সভাপতি, বাংলাদেশ টেরী টাওয়েল এন্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিটিএলএমইএ)।

বিভি/এজেড/জেডএস

মন্তব্য করুন: