জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, উঠে এলো যেসব বিষয়
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার প্রথম ভাষণ।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় ভাষণের শুরুতেই বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদানও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানান।
জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে নিজের অনুভূতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মঞ্চে দাঁড়িয়েই তার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। একইভাবে তিনিও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ এবং একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, বহুপাক্ষিকতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও জলবায়ু অর্থায়ন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এই সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা কামনা করেন। বাসসের প্রকাশিত ভাষণের বিবরণেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে সংকটের সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার প্রসঙ্গে তিনি জনগণের কল্যাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর সরকারের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন।
‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’- এই প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তার সরকার কাজ করছে, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু তার সব সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে। সর্বোপরি, জনগণ একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা পাবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশের কথা তুলে ধরে তিনি প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল যাতে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, সে জন্য জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
এ ছাড়া ভাষণে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
ভাষণের শেষাংশে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তুলতে জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: