‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগানে উত্তাল ঢাকার রাজপথ
‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগান আজও উচ্চারিত হয়েছে রাজধানীর নয়াপল্টনে। শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে রাজধানীতে ঐতিহাসিক সার্বভৌমত্ব র্যালিতে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজনটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। র্যালি উদ্বোধন করেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিএনপির অস্থায়ী মঞ্চের চারপাশ এবং নয়াপল্টনসহ আশপাশের সব এলাকা নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নেতা-কর্মীদের নানা স্লোগানে মুখরিত ছিলো সমাবেশ ও র্যালি।
এর মধ্যে নয়াপল্টনের জোনাকি সিনেমা হলের সামনে কয়েকজন প্রবীণের স্লোগানে চোখ আটকে গেলো। ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছিলেন তারা। যেখানে লাখো নেতা-কর্মী বিএনপির দলীয় স্লোগান, ফ্যাসিবাদ বিরোধী স্লোগান প্রকম্পিত রাখছে রাজপথ, সেখানে ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়ার মুক্তি চাই’, ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগান!
যিনি স্লোগান ধরেন, তিনি জানান, তার নাম হুমায়ুন কবির। বয়স ৭৪ বছর। তাকে বেশ সুস্থ ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। তিনি জানান, তখনও রাজধানীর শাহবাগে থাকতেন, এখনো শাহবাগেই থাকেন। ১৯৭৫ সালের আগস্ট পরবর্তী সময়, বিশেষ করে নভেম্বরের বিভিন্ন ঘটনা বিষয়ে তিনি উৎকণ্ঠায় ছিলেন। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনানিবাসে শুরু হয় সিপাহি বিদ্রোহ। তার আগে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। তখন এনালগ যুগ, বিভিন্ন লোকমুখে নানা কথা ছড়াচ্ছিল।
তিনি বলেন, বয়স কম হলেও মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহামানের অবদান, স্বাধীনতার ঘোষক, সেক্টর কমান্ডার এবং সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়া বিষয়ে অবগত ছিলাম। বাবা-চাচাদের কাছ থেকেও শুনেছি। এ জন্য জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল। ৭ নভেম্বর বিদ্রোহী সৈনিকেরা জিয়াউর রহমানের বাসভবনে গিয়ে তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন। সেদিন সাধারণ জনতা ও সৈনিকগণ একাকার হয়ে ঢাকার রাজপথে নেমে পড়েন।
হুমাযুন কবির বলেন, তিনিসহ শাহবাগে তার অনেক সহপাঠী সেদিন রাজপথে মিছিলে যোগ দেন, আর্মিদের ট্যাংকে উঠেও স্লোগান দেন ও রাজপথে ট্যাংকে চড়ে সিপাহীদের সঙ্গে আনন্দে যোগ দেন। সেদিনের সে দৃশ্য ছিলো অভূতপূর্ব। সে ইতিহাস অনেকেই জানেন না। নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনানিবাসে ‘সিপাহি-সিপাহি ভাই ভাই’ এবং ‘জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেওয়া হয়। সেনানিবাসে ছড়িয়ে পড়ে ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগান। এর মধ্য দিয়ে ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সামরিক অভ্যুত্থানের অবসান ঘটে ৭ নভেম্বর।
এমন সব স্লোগানে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর উত্তাল হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাজপথ ও সেনানিবাস। ব্যারাক ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন সাধারণ সৈনিকেরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সাধারণ মানুষ। স্লোগানে-স্লোগানে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের বার্তা। একপর্যায়ে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করা হয় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। সেদিনের সেই স্লোগানগুলো কেবল ক্ষোভ কিংবা মুক্তির দাবি ছিল না, বরং দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির গভীর টানাপোড়েনেরও প্রতিফলন।
৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহের সূচনা হয়। ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ এবং ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়াউর রহমানের মুক্তি চাই’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সেনানিবাস। বিদ্রোহের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীতে। সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসেন। সৈনিক ও জনতার মধ্যে তৈরি হয় সংহতি। ট্যাংকের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর পাশাপাশি আধিপত্যবাদবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন তারা।
‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দিতে বিদ্রোহী সৈনিকেরা এগিয়ে যান জিয়াউর রহমানের বাসভবনের দিকে। সেখানে গিয়ে তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন তারা। এ সময় সেনানিবাস ও রাজপথে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ‘সিপাহি-সিপাহি ভাই ভাই’ এবং ‘জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগান।
জনতার কণ্ঠেও তখন একই স্লোগান, ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’। সেদিনের স্লোগানে একদিকে যেমন জিয়াউর রহমানের মুক্তির দাবি সামনে এসেছিল, অন্যদিকে তেমনি প্রকাশ পেয়েছিল সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া নানা প্রতিক্রিয়া।
মুক্তির পর ৮ নভেম্বর থেকে জিয়াউর রহমান সেনানিবাসে সৈনিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে শুরু করেন। বিভিন্ন সমাবেশে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন। বিকেলে চতুর্থ বেঙ্গলের লাইনের কাছে ঢাকা সেনানিবাসের সৈনিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন তিনি।
সে সময় সেনানিবাসের অধিকাংশ সৈনিক ছিলেন সশস্ত্র। জিয়াউর রহমান দৃঢ়কণ্ঠে তাদের অস্ত্র জমা দিয়ে নিজ-নিজ ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সৈনিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সেই ঘটনাপ্রবাহে স্লোগান ছিল বিদ্রোহের ভাষা, সংহতির প্রকাশ এবং রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ থেকে ‘জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’, প্রতিটি স্লোগানই ধারণ করেছিল সেই সময়ের অস্থিরতা, আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার পালাবদলের বার্তা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি তাই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
হুমায়ুন কবির বলেন, সেদিন তিনিসহ তার যেসব সহপাঠী সৈনিকদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দেন, তাদের অনেকে বেচেঁ নেই। এর মধ্যে তার সহপাঠী রহিম উদ্দিন, শরিফ মিয়া ও শাহবাগ এলাকার কয়েকজন বিএনপি সমর্থককে নিয়ে আজ এ দিবসে আসেন। এবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসটি বিএনপি গুরুত্বসহকারে পালন কববে সে খবর জানতাম। তাই এই বয়সেও আবেগ ও ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শহীদ জিয়াউর রহমানের ত্যাগ স্মরণে র্যালি ও সমাবেশে হাজির হলাম।
বিভি/এজেড













মন্তব্য করুন: