মানুষের জন্য যে কোনো আত্মত্যাগে আমি প্রস্তুত: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের জন্য যে কোনো আত্মত্যাগে তিনি প্রস্তুতু। বৃহস্পতিবার (২৩ জুন) বিকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জনগণের সংগঠন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সব সময় অধিকার বঞ্চিত, শোষিত, নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করতে হয়েছে, অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। কত পরিবার কষ্ট পেয়েছে, কত মানুষ জীবন দিয়েছে, আত্মত্যাগ করেছে তার কোনো হিসেব নাই। আওয়ামী লীগ মানুষের ভাগ্য গড়তে এসেছে। বাবা মা ভাই বোনকে হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলাম, একদিকে আওয়ামী লীগ আমাকে তাদের সভাপতি করেছিল। পাশাপাশি এদেশের জনগণের আশ্রয়ে আমি এসেছিলাম, তাদের মাঝেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার হারানো বাবা-মায়ের স্নেহ, আমার ভাইয়ের স্নেহ। তাই এদেশের মানুষের জন্য যে কোনো আত্মত্যাগেই আমি প্রস্তুতু।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অর্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আওয়ামী লীগ অর্থ মাতৃভাষায় কথা বলা, আওয়ামী লীগ অর্থ স্বাধিকার অর্জন। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা হয়। আজ আওয়ামী লীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে দলটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শামছুল হক সাধারণ সম্পাদক আর শেখ মুজিবুর রহমান হন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। যদিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন কারাগারে, কিন্তু তাকে নিয়েই এই সংগঠনটা গড়ে ওঠে পুরান ঢাকার কে এম দাশ লেনের রোজগার্ডেনে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এমন একটা কারণে যখন পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি হবার পর মাত্র সাত মাসের মধ্যে তাদের একটা বৈরি মনোভাব আমাদের পূর্ববাংলার মানুষের ওপর দেখা যায়। আমাদের মাতৃভাষা-বাংলা ভাষা কেড়ে নেবার প্রচেষ্টা, আর্থ-সামাজিকভাবে আমাদের নির্যাতন শোষণ শুরু করে। তারই প্রতিবাদে বাংলাদেশে শেখ মুজিব ’৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন, ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ’৪৯ সালে আওয়ামী লীগ সৃষ্টি হয়। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ এদেশে মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ সৃষ্টিলগ্ন থেকে সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। পাকিস্তান নামের দেশটি যারা আমাদের শোষণ করছিলো, দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, স্বাধীন জাতি হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছি। কাজে এই বাংলাদেশ নামটি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানেরই দেওয়া। আওয়ামী লীগকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে তোলার জন্য ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে নাম দেওয়া হয়েছিল পূর্ব বাংলা আওয়ামী লীগ। সকল দলমত জাতি নির্বিশেষে সবার জন্য এ দলকে উম্মুক্ত করা হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে কাউন্সিল অধিবেশনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামে দলটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আওয়ামী লীগ নামের সঙ্গে বাংলাদেশের যেমন স্বাধীনতা, অধিকার জড়িত, মাতৃভাষায় কথা বলা অধিকার এবং বাংলাদেশ একটা যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশ, যে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিল, সেই যুদ্ধ বিধ্বস্থ একটি দেশ এবং একটি প্রদেশকে রাষ্ট্রে উন্নীত করে একটি সংবিধান জাতির পিতা আমাদের দিয়েছিলেন, এবং অতি অল্প সময়, মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশ একটি স্বল্প উন্নত দেশের মর্যাদা পেয়েছিল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভাগ্য আমাদের, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জীবনে যে অমানিষার অন্ধকার নেমে আসে, আমরা শুধু জাতির পিতাকে হারাইনি, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সব সম্ভাবনাকেও হারিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়েছিল, জয় বাংলা স্লোগান নির্বাসিত হয়েছিল, যে স্লোগান দিয়ে লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে দীর্ঘ ২১ বছর অংশ নিয়ে বিজয় এনেছিল, তার বিসর্জন দেওয়া হয়। ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামটা মুছে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছিল। দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসে, এখন বাংলাদেশ বিশ্বে একটা মর্যাদা পেয়েছে। বর্তমানে আমরা উন্নয়ন শীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আওয়ামী লীগ দেশের জনগণের সেবা করার সুযোগ পেলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশের মর্যাদা পাবে। সেই পরিকল্পনাও তৈরি করে আমরা দিয়ে যাচ্ছি, আমি ২১০০ সালের ডেল্টা প্লানও তৈরি করেছি, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশ যাতে উন্নত সম্মৃদ্ধ দেশের মর্যাদা পায় সেই পরিকল্পনাও আমি তৈরি করেছি। এ ধারাবাহিকতা দিয়ে যদি এই দেশ চলতে থাকে এর অগ্রযাত্রা আর কেউ রুখতে পারবে না, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারে থাকি আর বিরোধী দলে থাকি-যখন দেশের মানুষ কোনো সমস্যায় পড়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে, জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে, সহযোগিতা করেছে। সিলেটের সুনামগঞ্জেও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা সবার আগে গেছে, সাহায্য করছে। এভাবে দেশের মানুষের সেবা করাই আওয়ামী লীগের আদর্শ, দায়িত্ব কর্তব্য। মানুষের সেবা করাই আমাদের মুক্তি যুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ।’
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু।
বিভি/এনএ



মন্তব্য করুন: