হৃদয়বিদারক যে ছবি জিতে নিলো বিশ্বসেরা পুরস্কার!
নামিবিয়ার মরুভূমিতে মৃত হাতিশাবক বহনরত এক স্ত্রী হাতির বিরল আচরণ ক্যামেরাবন্দি করে ২০২৬ সালের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতেছেন আলোকচিত্রী ফেদেরিকো ভেরোনেসি। ছবিটি হাতির আবেগ, শোক এবং পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর। নামিবিয়ার মরুভূমির একটি শুকিয়ে যাওয়া নদীখাত ধরে এগিয়ে চলেছে একদল হাতি। তাদের অনুসরণ করতে গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মুখোমুখি হন আলোকচিত্রী ফেদেরিকো ভেরোনেসি। একটি স্ত্রী হাতি তার শুঁড়ে জড়িয়ে বহন করছে সদ্য মৃত একটি হাতিশাবককে। শাবকটির ছোট ছোট পা শুঁড়ের চারপাশে জড়ানো, আর নিথর দেহটি ঝুলে রয়েছে শূন্যে।
ভেরোনেসির ভাষায়, মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও প্রায় আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে ভরা। শাবকটির দেহ তখনো অক্ষত ও নরম ছিল। শক্ত হয়ে যায়নি। তাই তার ধারণা, শাবকটি আগের রাতে অথবা ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই জন্মেছিল। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, সন্তান হারানোর শোকে শাবকটিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে মা হাতিটি। কিন্তু পরে জানা যায়, শাবকটি তার নিজের নয়। আর এই তথ্যই ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
কয়েক ঘণ্টা ধরে হাতির দলটির সঙ্গে থেকে বেশ কিছু ছবি তোলেন ভেরোনেসি। এর মধ্যে একটি ছবি ২০২৬ সালের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ পুরস্কার জিতে নেয়। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা বন্য প্রাণী ও প্রকৃতির অসাধারণ মুহূর্তগুলো তুলে ধরার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
ভেরোনেসি জানান, স্ত্রী হাতিটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মৃত শাবকটিকে বহন করেছে। মাঝেমধ্যে খাবার খেতে কিংবা পানি পান করতে শাবকটিকে মাটিতে নামিয়েছে। এরপর আবার তুলে নিয়ে হুয়াব নদীর পাশ ধরে চলতে শুরু করেছে। ভেরোনেসি বলেন, দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। কিন্তু মানুষের সামনে এটি তুলে ধরা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেছিলেন। তার মতে, ছবিটি দেখায়, হাতিরাও কতটা কষ্ট পেতে পারে এবং তাদের অনুভূতি কতটা গভীর হতে পারে- যা অনেকেই হয়তো প্রাণীদের ক্ষেত্রে কল্পনা করেন না।
হাতি ও মানুষের সহাবস্থান নিয়ে কাজ করা নামিবিয়ার অলাভজনক সংস্থা এলিফ্যান্ট হিউম্যান রিলেশনস এইডের (ইএইচআরএ) সংরক্ষণ কর্মসূচির পরিচালক ক্রিস্টিন উইন্টার জানান, স্ত্রী হাতিটি বর্তমানে ১৪ বছর বয়সী। দুই বছর আগে সে নিজের শাবক হারিয়েছিল। এরপর থেকে অন্য হাতির মৃত শাবক বহন করতে তাকে চারবার দেখা গেছে। ওই এলাকায় এমন আচরণ নথিবদ্ধ করার ঘটনা এটিই প্রথম বলে জানান উইন্টার।
ভেরোনেসির মতে, এই তথ্য হাতির আবেগের গভীরতা সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। নিজের শাবক হারানোর পর অন্য হাতির মৃত শাবককে বারবার বহন করার আচরণ দেখে তার মনে হয়েছে, যেন হাতিটি নিজের হারানো সন্তানের সঙ্গে আবারও সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সে যেন সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্ত্রী হাতিটি কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে মৃত শাবক বহন করে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে এ বিষয়ে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

উইন্টারের ধারণা, এটি হতে পারে মৃত্যুজনিত শোক সামলে ওঠার একটি প্রক্রিয়া। শাবকটির মৃত্যু মেনে নিতে না পারা কিংবা নিজের সন্তান হারানোর মানসিক আঘাতের কারণে হাতিটি এমন আচরণ করতে পারে। প্রতিবার কোনো হাতিশাবক মারা গেলে তার মধ্যে একই আচরণ দেখা দেওয়ার পেছনেও পুরোনো সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব থাকতে পারে। আবার শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে মৃত শাবকটির দেহ রক্ষা করার চেষ্টাও এর একটি কারণ হতে পারে।
আফ্রিকার সাভানা হাতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞ এবং সংরক্ষণ সংস্থা এলিফ্যান্ট ভয়েসেসের প্রতিষ্ঠাতা জয়েস পুল বলেন, ভেরোনেসির ছবিগুলো সত্যিই হৃদয়বিদারক। কেনিয়ায় নিজের মৃত শাবকের প্রতি একটি মা হাতির একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তিনি দেখেছিলেন। তবে সেই হাতিটি শাবককে বহন করেনি; বরং সেটিকে তোলার চেষ্টা করেছিল এবং দুই দিন ধরে তার পাশে দাঁড়িয়ে সেটিকে রক্ষা করেছিল।
পুলের আশা, এসব ছবি মানুষকে বুঝতে সাহায্য করবে যে হাতিরাও শোক ও কষ্ট অনুভব করতে পারে।
ভেরোনেসির ছবিগুলো নামিবিয়ার মরুভূমিতে বসবাসকারী হাতিদের জীবনযাত্রার বিরল চিত্র তুলে ধরেছে। এই অঞ্চলে প্রায় ১৫০টি মরুভূমির হাতি রয়েছে। তারা মরুভূমির পাঁচটি নদীখাত ঘিরে বসবাস করে এবং খাবার ও পানির সন্ধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। কখনো আনা গাছের বীজের শুঁটি, কখনো নদীর প্লাবনভূমির ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকে।
এরা আলাদা কোনো হাতির প্রজাতি নয়; বরং শুষ্ক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হাতির একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী। জিনগত পরিবর্তনের পরিবর্তে অভিজ্ঞতা ও শেখা আচরণের মাধ্যমে তারা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল আয়ত্ত করেছে। নামিবিয়ার স্কেলেটন কোস্ট অঞ্চলের মরুভূমির সিংহদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোজন দেখা যায়।
উইন্টারের মতে, এই হাতিদের বিশেষত্ব তাদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। একই সঙ্গে এটাই তাদের দুর্বলতার জায়গা। কারণ, একবার সেই জ্ঞান হারিয়ে গেলে তা সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। গত ২০ বছরে নামিবিয়ার এই হাতির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে বলে জানান উইন্টার। দীর্ঘ সময়ের খরা ও পরিবেশগত চাপ এর অন্যতম কারণ। তবে মানুষের সঙ্গে সংঘাত বেড়ে যাওয়াকে তিনি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
উইন্টারের ভাষায়, এই সংঘাতের বড় অংশই পানিকে কেন্দ্র করে। হাতিরা খাবার ও পানির সন্ধানে খামারে ঢুকে পানির ট্যাংক ফেলে দেয়, পাইপ উপড়ে ফেলে এবং পানির পাম্প ভেঙে দেয়। ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে হাতির উপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ে। এসব সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায়।
মরুভূমির হাতিদের ক্ষেত্রে নবজাতক শাবকের মৃত্যুহার বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। উইন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ১৬টি শাবকের মধ্যে মাত্র দুটি বেঁচে ছিল।

এত বেশি শাবক মারা যাওয়ার একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, তাদের কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম নিচ্ছে। উইন্টারের ধারণা, মা হাতিগুলো শারীরিকভাবে পর্যাপ্ত সুস্থ না থাকায় গর্ভধারণের পূর্ণ মেয়াদ পর্যন্ত শাবক বহন করতে পারছে না। মানুষের সঙ্গে সংঘাত থেকে তৈরি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হাতির মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) বা মানসিক আঘাত-পরবর্তী চাপজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। উইন্টার জানান, ইএইচআরএর কর্মীরা যখনই মৃত হাতিশাবকের সন্ধান পান, সেগুলোর আকার সাধারণত খুব ছোট থাকে। তার তথ্য অনুযায়ী, সুস্থ নবজাতক হাতিশাবকের ওজন সাধারণত ১০০ থেকে ১২০ কেজি। বিপরীতে, মৃত অবস্থায় পাওয়া শাবকগুলোর ওজন প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কেজি।
নামিবিয়ার মরুভূমির হাতিদের ওপর পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ভূমিকা বোঝার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা। এ লক্ষ্যে ইএইচআরএ কাজ করছে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের হাতি বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েলা চুসিডের সঙ্গে।
২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে এই প্রকল্পের। এর অংশ হিসেবে হাতির বিষ্ঠার নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব নমুনায় ভারী ধাতু ও দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক পদার্থ- যেমন পিএফএএস- আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি হাতির থাইরয়েড হরমোন ও কর্টিসলের মাত্রাও যাচাই করা হবে। কর্টিসল শরীরের মানসিক চাপ-সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি হরমোন।
চুসিড জানান, গবেষকেরা এই জনগোষ্ঠীর হাতিদের মধ্যে অন্তঃপ্রজননের মাত্রাও নির্ধারণ করতে চান। অন্য হাতির জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করে দেখতে চান, বেঁচে থাকা শাবক ও মারা যাওয়া শাবকদের বংশগত বৈশিষ্ট্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না।
হাতিদের মধ্যে শোকের প্রকাশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। সঙ্গী বা পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে হাতিদের মৃতদেহের অবশিষ্টাংশের কাছে যেতে, হাড় স্পর্শ করতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের আচরণকে মৃত সঙ্গীর পাশে নীরবে অবস্থান করার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
তবে পুলের মতে, নামিবিয়ার মরুভূমির হাতিরা জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি ট্রফি হান্টিংয়ের অনুমতির কারণেও বিলুপ্তির কিনারায় পৌঁছে যাচ্ছে। তাদের দুর্ভোগ কমাতে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ভেরোনেসির কাছে স্ত্রী হাতি ও মৃত শাবকের মধ্যকার এই দৃশ্য প্রায় মানুষের মতো আচরণের উদাহরণ। তার আশা, ছবিগুলো হাতির অনুভূতির গভীরতা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নতুন উপলব্ধি তৈরি করবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি হাতিই এমন এক প্রাণী, যাকে বোঝা এবং সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। শুধু একটি প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি প্রাণীর সুস্থতা ও কল্যাণ নিশ্চিত করাও জরুরি। ভেরোনেসির প্রত্যাশা, তার ছবিগুলো মানুষের সামনে হাতির অন্তর্জগৎ ও অনুভূতির গভীরতা দেখার জন্য ছোট্ট একটি জানালা খুলে দেবে।
সূত্র: বিবিসি
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: