নির্বাচনে এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যেমন আমাদের জীবনে অনেক সুবিধা এনে দিচ্ছে, তেমনি এটি নতুন নতুন হুমকিও তৈরি করছে। নির্বাচন যেহেতু সন্নিকটে তাই, সম্প্রতি এর কিছু অপব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই এর মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। বিগত দিনের নির্বাচনেও এআই এর অপব্যবহার হয়েছিল। কিন্তু, সেটার ব্যবহার ছিল খুব কম। এখন যেহেতু মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন এবং এআইভিত্তিক চ্যাটবট যে কেউ ব্যবহার করতে পারে, তাই এর অপব্যবহার নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। নির্বাচন আসলে নতুন নতুন গুজব তৈরি করা হয়। নতুন নতুন বট একাউন্টের আবির্ভাব হয়। ভুলতথ্য ও অপতথ্যের ছড়াছড়ি সোশাল মিডিয়াগুলোতে এবং সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এআইভিত্তিক ডিপফেক ভিডিও, অডিও ও ছবির অহরহ ব্যবহার।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে দেওয়া একটা প্রযুক্তির নাম হলো ডিপফেক, যার মাধ্যমে হুবহু অন্যের মুখাবয়ব ব্যবহার করে খুব বাস্তবসম্মত ভিডিও ও ছবি তৈরি করা সম্ভব এবং তা আসল মানুষের মতোই দেখায়। এই ভিডিও বা ছবিগুলো সাধারণত রাজনৈতিক, সামাজিক, বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ডিপফেকের বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে পর্নোগ্রাফিতে, যা সেলিব্রেটিদের টার্গেট করে তৈরি করা হয়। নির্বাচনে প্রার্থীর মুখ বা কণ্ঠ ব্যবহার করে ভুয়া বক্তব্য বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া, কোনো প্রার্থীর নামে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এবং, ভোটের আগেই তা ছড়িয়ে দিলে মানুষ বেশি বিভ্রান্ত হবে। নির্বাচনের আগের ২৪-৪৮ ঘণ্টা সবচেয়ে বিপজ্জনক।
এআই দিয়ে হাজার হাজার ভুয়া নিউজ, পোস্ট, ব্লগ বানানো যাচ্ছে সহজে। নির্বাচনের পূর্বে ভোট বাতিল, নির্বাচন স্থগিত বা অমুক প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে; এমন গুজব ছড়াতে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে এবং হবে। ইতোমধ্যে সোশাল মিডিয়াগুলোতে বিভিন্ন বট একাউন্ট ও ভুয়া পেইজের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। এইসব বট একাউন্ট দিয়ে প্রতিপক্ষকে খারাপভাবে উপস্থাপন, বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এক পক্ষকে ভালোভাবে উপস্থাপন ও অন্য পক্ষকে খারাপভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে এর মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, এআই দিয়ে হাজার হাজার ভুয়া রিভিউ বা কমেন্ট তৈরি করা হচ্ছে, যা দিয়ে রাজনীতিকভাবে সব জায়গায় জনমতকে প্রভাবিত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। কে বেশি জনপ্রিয় এবং কোন দল ক্ষমতায় আসবে, কত পার্সেন্ট ভোট পাবে, তা ভুয়া বট একাউন্ট দিয়ে তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
এআই এর অপব্যবহার রোধে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের করণীয়:
এআই হতে পারে নির্বাচনের সহায়ক প্রযুক্তি। কিন্তু, নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এটি হয়ে উঠবে গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। এআই এর অপব্যবহার রোধে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন নিন্মোক্ত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারে-
১. নির্বাচনের সময় সন্দেহজনক, ভুয়া, ফেক কনটেন্ট দ্রুত নামানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যেমন, ফেসবুক, এক্স, ইনস্ট্রাগ্রাম, ইউটিউবের সাথে চুক্তি করতে হবে।
২. নির্বাচন কমিশনের অধীনে ডিপফেক শনাক্ত করার টুল ও বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যেমে একটা সেন্ট্রাল ইউনিট গঠন করা, যারা ২৪/৭ (সকল সময়) মনিটরিং করবে।
৩. ভুয়া এআইভিত্তিক কনটেন্ট ছড়ালে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে এআই ব্যবহার সংক্রান্ত স্পষ্ট আইন ও নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
গুজব শনাক্ত করতে দ্রুত ফ্যাক্টচেকিং সিস্টেম থাকা এবং অনলাইনভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
৪. ভোটারদের সচেতনতা তৈরি করতে ডিপফেক ভিডিও কিভাবে চিনবেন, সেই বিষয়ক ক্যাম্পেইন তৈরি করা এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচার করা।
৫. নির্বাচন কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ থাকা এবং এআই অপব্যবহার না করার লিখিত অঙ্গীকার করা।
এআই এর অপব্যবহার রোধে দ্রুপ পদক্ষেপ না নিলে, নির্বাচনের আগে ও পরে যে কোন সময় যেকোন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই, এআই এর সঠিক ব্যবহার জানুন, সচেতন থাকুন, নিরাপদ থাকুন।
লেখকঃ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, সাইবার ক্যানিয়ন
‘AI প্রযুক্তির হাতে খড়ি’ বইয়ের লেখক।
(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না।)
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: