• NEWS PORTAL

  • শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গু: বাড়ছে আতঙ্ক, বাড়ছে ভয়, কতটা প্রস্তুত আমরা?

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম 

প্রকাশিত: ১৯:৩৯, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
ডেঙ্গু: বাড়ছে আতঙ্ক, বাড়ছে ভয়, কতটা প্রস্তুত আমরা?

একসময় ডেঙ্গু নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা মূলত বর্ষাকালেই সীমাবদ্ধ ছিল। বৃষ্টি এলে ডেঙ্গু বাড়বে, শীত এলে কমে যাবে। এখন আর বিষয়টি এত সহজ নেই। কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি, ডেঙ্গুর সময়কাল যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি এর বিস্তারও ঢাকা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে গেছে। তাই ডেঙ্গুকে মৌসুমি একটি রোগ হিসেবে দেখে কয়েক মাস তৎপর থাকা আর যথেষ্ট বলে মনে হয় না।

এ বছরের হিসাবটিও স্বস্তির নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের Dengue Dynamic Dashboard বলছে, ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ হাজার ১৬৩ জন। মারা গেছেন ১৬৪ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন, মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। আক্রান্তদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাও বেশ বড়। ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৩১ জন, যা বয়সভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ।

প্রতিদিন এসব সংখ্যা সংবাদে আসে। আমরা দেখি, হয়তো পরদিন ভুলেও যাই। কিন্তু ১৬৪ জনের মৃত্যুকে একটু অন্যভাবে ভাবুন। ১৬৪টি পরিবার একজন করে মানুষ হারিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৫ হাজার মানুষের প্রত্যেকের সঙ্গে আরও কয়েকজন মানুষের উদ্বেগ, সময় ও অর্থ জড়িয়ে আছে। কোনো শিক্ষার্থী কয়েক দিন ক্লাস করতে পারেননি, কেউ অফিসে যেতে পারেননি, আবার কারও পরিবারকে হাসপাতালে রাত কাটাতে হয়েছে। তাই ডেঙ্গুর ক্ষতি শুধু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না।

আমার কাছে এবারের তথ্যের আরেকটি দিক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আমরা এখনও কথায় কথায় ডেঙ্গুকে ঢাকার সমস্যা হিসেবে দেখি। অথচ সরকারি ড্যাশবোর্ডে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ হাজার ৯৬, আর সিটি করপোরেশনের বাইরে ৪১ হাজার ৭০১। এই ব্যবধান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ডেঙ্গু এখন জেলা-উপজেলারও সমস্যা। কাজেই ঢাকায় কী হচ্ছে, শুধু সেটি দেখলে দেশের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

এর মধ্যেই সরকার দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে। ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন মাসব্যাপী এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। কর্মসূচি ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা। এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা, জনসচেতনতা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের কথা এতে বলা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগ রয়েছে। শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবীদের যুক্ত করার বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ মশার প্রজননস্থল কেবল রাস্তাঘাটে নয়। আমার বাড়ির ছাদে হতে পারে, আপনার বারান্দায় হতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভবনের পেছনে ফেলে রাখা পাত্রেও হতে পারে। এসব জায়গায় প্রতিদিন সিটি করপোরেশনের কর্মী গিয়ে পানি জমেছে কি না দেখে আসবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

এই জায়গায় আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু করতে পারে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। আমার অভিজ্ঞতায়, একটি ভালো কাজে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হলে তার প্রভাব ক্যাম্পাসের সীমানায় আটকে থাকে না। একজন শিক্ষার্থী তার পরিবারে কথা বলে, বন্ধুদের বলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী যদি সপ্তাহে এক দিন নিজের হল, বিভাগ, বাসা ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না দেখে, কাজটি খুব ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু একই কাজ যদি দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখো শিক্ষার্থী করে, ফলটা আর ছোট থাকবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও একটি দায়িত্ব আছে। সেটি গবেষণা। আমরা গবেষণাপত্র প্রকাশ করি, সম্মেলনে ফলাফল উপস্থাপন করি। কিন্তু স্থানীয় একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানেও সেই গবেষণার ব্যবহার থাকা দরকার। কোন এলাকায় ডেঙ্গু বেশি হচ্ছে, এডিসের ঘনত্ব কোথায় বাড়ছে, বৃষ্টিপাত বা তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে রোগীর সংখ্যার কোনো সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে কি না, এসব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করতে পারে। সেই তথ্য যদি স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সময়মতো পৌঁছায়, গবেষণার সামাজিক মূল্যও বাড়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড ইতিমধ্যে আমাদের অনেক তথ্য দিচ্ছে। আমি মনে করি, এই ডেটার ব্যবহার আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে। প্রতিদিন কতজন রোগী হাসপাতালে এলেন, সেটি জানা অবশ্যই দরকার। কিন্তু তার চেয়েও কাজে লাগবে যদি তথ্য দেখে আগেই বোঝা যায়, আগামী কয়েক সপ্তাহে কোন এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিতে যেতে পারে। রোগী বাড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে রোগী বাড়ার আগেই সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো নিশ্চয়ই বেশি ফলপ্রসূ।

একই কথা হাসপাতালের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ডেঙ্গুর চাপ বাড়ার পর শয্যা ও জনবল নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার বদলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে আগেই প্রস্তুত রাখা দরকার। রোগীর বিপদের লক্ষণ দ্রুত চিহ্নিত করা, প্রয়োজন হলে যথাসময়ে উচ্চতর হাসপাতালে পাঠানো এবং সাধারণ মানুষকে কখন হাসপাতালে যেতে হবে তা পরিষ্কারভাবে জানানো খুবই জরুরি। ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর প্রয়োজন নেই। আবার জ্বর কমেছে বলে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়াও সব ক্ষেত্রে নিরাপদ নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটাই আসল।

আমাদের নিজেদের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সরকার ফগিং করতে পারে, পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে পারে, হাসপাতাল প্রস্তুত রাখতে পারে। কিন্তু আমার বাসার ছাদে একটি বালতিতে কয়েক দিন পানি জমে থাকলে সেটি ফেলে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। এই সহজ কথাটি আমরা জানি। সমস্যা হলো, জানার সঙ্গে নিয়মিত করার ব্যবধানটা এখনও অনেক বড়।

গত বছরের অভিজ্ঞতাও খুব পুরোনো নয়। ২০২৫ সালে দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, মারা গিয়েছিলেন ৪১৩ জন। তারপর আবার নতুন বছর এসেছে, আবার আমরা আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব করছি। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রতিবছর রোগী বাড়ার পর আমরা নড়েচড়ে বসব, নাকি তার আগেই কিছু কাজ নিয়মিত করব?

সরকারের চলমান তিন মাসের কর্মসূচিকে আমি সেই নিয়মিত কাজের শুরু হিসেবে দেখতে চাই। ডিসেম্বর এলে কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু এডিস মশা তো সরকারি কর্মসূচির ক্যালেন্ডার দেখে প্রজনন করবে না। তাই পরিচ্ছন্নতা, মশার উৎস ধ্বংস, স্থানীয় নজরদারি এবং মানুষের সচেতনতা তিন মাসে থামলে হবে না।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ বা স্থানীয় সরকারকে একা দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের দায়িত্ব অবশ্যই আছে এবং সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ, সামাজিক সংগঠন, পরিবার এবং ব্যক্তি হিসেবেও আমাদের কাজ আছে।

দিন শেষে হিসাবটা খুব সাধারণ। কতবার ফগিং হলো, কতটি অভিযান হলো কিংবা কতজনকে জরিমানা করা হলো, এগুলো কাজের হিসাব। কিন্তু ফলাফলের হিসাব অন্য জায়গায়।

এ বছর ডেঙ্গুতে কতজন আক্রান্ত হলেন, সেই সংখ্যা আমরা জানব। তার পাশাপাশি জানতে চাই, আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কতজন আক্রান্ত হওয়া থেকে বেঁচে গেলেন।

লেখক: উপ-উপাচার্য ও অধ্যাপক, ফার্মেসী বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার বাংলাভিশন নিবে না)

বিভি/এজেড

মন্তব্য করুন: