তারেক রহমানকে গ্রেফতার ‘কালো অধ্যায়’, তার কারাদিবস বাংলাদেশের রাজনীতির একটি প্রতীক
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে কিছু তারিখ আছে যা কেবল ক্যালেন্ডারের সংখ্যা নয় বরং রাষ্ট্রের স্নায়ুতন্ত্রে স্থায়ীভাবে লেখা একেকটা অধ্যায়। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ ঠিক তেমনই একটি দিন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, বিনা ওয়ারেন্ট এবং বিনা মামলায় যেভাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তার বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো-এটি একটি কালো অধ্যায়।

২০০৭ সাল জানুয়ারি মাস। সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ওয়ান ইলেভেনের সরকার। দেশের রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের তখন তাড়া করে ফিরছে গ্রেপ্তার আতঙ্ক। ফখরুদ্দিন মইনুদ্দিন ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দু’মাসে ১৫০ জনের বেশি রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীকে আটক করা হয় দুর্নীতির অভিযোগে।
তখনই অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান যেকোনো সময় গ্রেফতার হতে পারেন। হয়েছেও ঠিক তাই- ২০০৭ সালের ৭ মার্চ ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়।
একজন স্বাক্ষি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ৭ মার্চ রাতে অতর্কিতভাবে বাড়ি ঘেরাও করে তার রুমে ঢুকে জোর করে নিয়ে যায়। এসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া তাদের কাছে বিনা ওয়ারেন্টে দেখতে চান। কিন্তু তারা দেখাতে পারেনি। এই অন্যায়টি আমাদের বুকের মধ্যে একটি কালো দাগ হয়ে আছে। আটকের সময় তারেক রহমান নিজের কথা ভাবেননি। তিনি সবসময় তার পরিবার এবং আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবেছেন।
আটকের মাত্র মাস ছয় আগেও রাজনীতিতে সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি ছিল তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। গ্রেফতারের পর তাকে যেভাবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল সেটি দেখে অনেকেই চমকে উঠেছিলেন। র্যাবের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট এবং হেলমেট পড়িয়ে ঢাকার একটি আদালতে তোলা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড নেয়া হয়েছিল। তারেক রহমান এবং বিএনপির তরফ থেকে এরপর অভিযোগ তোলা হয়েছিল রিমান্ডে তার উপর অমানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, রিমান্ডের সময় ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৮ ঘন্টাই তারেক রহমানের হাত ও চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, বাঁধা অবস্থায় ঝুলিয়ে আবার ফেলে দেয়া হয় এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের অভিযোগ দলের পক্ষ থেকে তখন বেশ জোরালোভাবে তোলা হয়েছিল।
জেল থেকে যখন তারেক রহমান বের হন তখন তিনি প্রচন্ড অসুস্থ ছিলেন। হাঁটতে পারছিলেন না। হুইলচেয়ার ছিল তার চলাচলের একমাত্র সম্বল। তার দল বিএনপি তখন তারেক রহমানের জীবননাশের শঙ্কাও করেছিল।

৫ আগস্টের পর বিবিসি বাংলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় মূল্যায়ন করতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, এক বাক্যে বা সংক্ষেপে বলতে হয় ১/১১ সরকার ছিল একটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত, অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত সরকার। তিনি বলেন, সেই সরকার দেশের রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার মধ্যেই ভেঙে দিতে চেয়েছিল। তারা রাজনীতিকে বিরাজনীতিকরণ করে দেশের জনজীবনকে অন্ধকারের দিকেও ঠেলে দিতে চেয়েছিল।
তারেক রহমান গ্রেফতার হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়া নিজেও আটক হন। অনেকে ধারণা করেছিলেন যে সরকারের সাথে সমঝোতা করে দুই ছেলেকে নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া হয়তো দেশের বাইরে চলে যেতে পারেন। সকলের অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়। সরকারের প্রবল চাপ উপেক্ষা করে বিদেশে না গিয়ে দেশেই থেকে যান বেগম খালেদা জিয়া।
২০০৮ সালের শুরুর দিকেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ে। ফলে বছরের শেষ নাগাত সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন হচ্ছে। সব দলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তখন থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করে তত্ত্বাবধয়ক সরকার।
সে সময়কার ঘটনাগুলো পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এসেছে। তাতে উল্লেখ করা হয়, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় সাবজেলে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনে অংশ নিতে খালেদা জিয়াকে রাজি করানো। কিন্তু দুই ছেলে তারেক রহমান আরাফাত রহমান কোকোর মুক্তি ছাড়া কোন ধরনের আলোচনায় বসতে রাজি হলেন না বেগম জিয়া।
কারাগারে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে সেনা কর্মকর্তারা ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে মুক্তি দিতে সম্মত হলেও তারেক রহমানের ব্যাপারে ছাড় দিতে রাজি হননি। কিন্তু বিএনপি নেত্রীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল উভয় ছেলের মুক্তি এবং তাদের বিদেশে উন্নত চিকিৎসা।
মুক্তি পাওয়ার আগে ১৩টি মামলায় জামিন পান তারেক রহমান। ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের তেশরা সেপ্টেম্বর তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এর আট দিনের মাথায় ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে। আর ওই দিনই কারাগার থেকে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। মুক্তি পাওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই চিকিৎসাধীন ছেলেকে দেখতে পিজি হাসপাতালে যান তিনি। প্রায় দুই ঘন্টা ছেলের পাশে অবস্থান করেন। সে সময় এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
তারেক রহমানের দেশ ছাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন কথা ছড়াতে থাকে নানা মহলে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাজনৈতিক সমঝোতা করে তারেক রহমান দেশ ছেড়েছেন। অন্তত তিন বছর রাজনীতি না করার শর্তেও রাজি হওয়া। এমনকি সম্মতিপত্রেও স্বাক্ষর দিয়েছেন তারেক রহমান। এসব কথা ছড়ালেও আসলে এর কোনো সত্যতা মেলেনি আজও।
প্রয়াত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বেগম খালেদা জিয়া বেশ ভালো করে বুঝেছিলেন যে তারেক রহমান যদি সেই মুহূর্তে মুক্তি না পান, তাহলে আর কখনোই দেশ ছেড়ে যেতে পারবেন না। যেকোন একটি মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হলেই তার কারাবাস অনেক দীর্ঘ হতে পারতো।
২০০৮ সাল থেকে ২০২৫ দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ব্রিটেনে নির্বাসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো-বিএনপিকে ভাঙতে আওয়ামী লীগ সরকারের সকল ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বিদেশে থেকে চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সুসংহত রাখতে পেরেছেন।
ইতিহাসে ঘাটলে দেখা যায়, চার্লস দ্য গল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডন থেকেই ফ্রান্সের রাজনীতি পরিচালনা করেছিলেন। আয়াতুল্লাহ খোমেনি প্যারিসে বসেই ইরানের বিপ্লবের পরিকল্পনা করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়াতেও এমন নজির আছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও প্রায় একই দৃশ্য তৈরি হয়। লন্ডনের একটি বাড়ি থেকে তিনি প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনীতি পরিচালনা করেছেন।
আজ যখন তারেক রহমানের ৭ মার্চের কারাবন্দি দিবস স্মরণ করা হয়, তখন সেটি কেবল অতীতের একটি স্মৃতি নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি প্রতীক। কারাগার, নির্বাসন, প্রত্যাবর্তন—এই তিনটি ধাপ একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনেই কোনো না কোনোভাবে দেখা যায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও সেই গল্পটিই দেখা গেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর গতবছরের ২৫শে ডিসেম্বর সতের বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে প্রত্যাবর্তন করেন তারেক রহমান। গতবছরের ৩০শে ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দশদিন পর চলতি বছরের ৯ই জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের পদে অভিষিক্ত হন। একই সাথে এবারই প্রথম বিএনপির নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিলেন তারেক রহমান এবং তিনি নিজেও প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বগুড়া এবং ঢাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার দলও পেয়েছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।

প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আবার নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়। এদিন সকালে সংসদ ভবনে নতুন এমপিদের পর বিকেলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ও মন্ত্রীদের শপথ নেয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন সরকারের পথচলা।

বিভি/এজেড



মন্তব্য করুন: