• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

শামীম ওসমানের ডুপ্লেক্স বাড়ি এখন পাখির বাসা!

প্রকাশিত: ১৩:০৮, ২৪ আগস্ট ২০২৬

ফন্ট সাইজ

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে এক ভয়ের নাম শামীম ওসমান। ডাক্তার গলির এই বাড়ির দিকে তাকাতে একসময় ভাবতে হতো কয়েকবার। ভয়ে মানুষের হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যেতো। অথচ সেই বাড়ির সামনে এখন দাঁড়িয়ে থাকে ময়লার গাড়ি। ডুপ্লেক্স বাড়ির যেই রুমে শামীম ওসমান ঘুমাতেন, সেখানে পাখিরা এখন ডিম পাড়ে।

১৯২০ এর দশকে কুমিল্লা থেকে নারায়ণগঞ্জে আসেন সেলিম ও শামীমের দাদা এম ওসমান আলী। ওসমান পরিবারের পতন শুরু হয় ১৯৯৬ সালে শামীম ওসমানের এমপি হওয়ার মধ্য দিয়ে। নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে ভয়ংকর রাজনীতিবিদের তকমা লাগে তার গায়ে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রায় পুরো নারায়ণগঞ্জ ছিলো তার দখলে। শামীম ওসমান ও তার ক্যাডারদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে পুরো নারায়ণগঞ্জবাসী। স্থানীয় সন্ত্রাসীদের এই গডফাদারের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো সাহসও দেখাতে পারেনি কেউ। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পর শামীম ওসমান প্রথমে ভারতে পালিয়ে যান। জনশ্রুতি আছে সেইসময় তিনি বোরখা পরেই পালিয়েছিলেন। 

২০০৬ সালে পলাতক অবস্থা থেকে ফিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আবির্ভূত হলেও ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের পট পরিবর্তনের আগের দিন আবারও দেশ ছেড়ে পালান। ফিরে আসেন ২০০৯ সালের এপ্রিলে। ততদিনে তার দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছরে কায়েম করেন এক ত্রাসের রাজত্ব। অভিযোগ আছে স্কুলছাত্র ত্বকী এবং রাজীব হত্যাসহ চাঞ্চল্যকর সাত খুনের নেপথ্যে ছিলেন শামীম ওসমান।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর সাথে সাথে তৃতীয়বারের মতো আবারো দেশ ছেড়ে পালায় শামীম ওসমান ও তার পরিবার। ১৫ বছরে নির্যাতিত নিষ্পেষিত মানুষেরা শামিম ওসমানকে না পেয়ে ক্ষোভ মেটায় তার জামতলার ডুপ্লেক্স বাড়িটির ওপর। একদিন আগেও ৪ আগস্ট ২০২৪-এ যে বাড়িটি ছিল জাঁকজমকপূর্ণ, তা মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।’

প্রায় দু’বছর পর শামীম ওসমানের আলীশান বাড়িতে যায় টিম বাংলাভিশন। টিনের বেড়ার ভেতরের দৃশ্য বিশ্বাস করা কঠিন। বাড়ি ঠিকই আছে, কিন্তু নেই সেই মানুষগুলো। যাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ ছিলো ভীতসন্ত্রস্ত। সামনের সুন্দর বাগান এখন ময়লার ভাগারে পরিনত হয়েছে। গাড়ির পার্কিংয়ে পানি জমে পোকামাকড় ও মশা জন্মাচ্ছে। নেই সামনের সেই মনোরম ঝর্না, শাপলার প্রতিকৃতি।

নিচতলার মেহমান খানা; এখানেই বসাতেন দরবার। ডেকে এনে দেখাতেন ভয়। করতেন দখল বাণিজ্য লুটপাটের পরিকল্পনা। সেই রুমগুলো পুড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। দেয়ালে লেগে আছে ক্ষতচিহ্ন। পড়ে আছে সিরামিকের কাপ-পিরিচ-প্লেট। দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো ছিলো দামি আসবাবপত্র। 

সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই দেয়ালে চোখে পড়ে নানা প্রতিবাদী লেখা। যে ঘরে ঘুমাতেন শামীম ওসমান ও তার স্ত্রী সেখানে বিছানার পোড়া অংশ ঠায় দাঁড়িয়ে। পাশের অংশে ছিলো আলিশান বাথরুম। সবকিছু ভেঙে চুরমার করেছে উত্তেজিত জনতা। এই উপরের অংশে এখন বাসা বেধেছে কবুতর। এখানে ডিম দিয়েছে তারা। ডিমের খোসা পড়ে আছে নিচে। ব্যালকোনির অবস্থাও নাজুক।

পাশের এই রুমটিতে কিছুই নেই। আছে শুধু জনতার ক্ষোভের চিহ্ন। বিদ্যুতের তারসহ সবকিছুই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এখন পরিত্যাক্ত অবস্থায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পৈশাচিক দাপটে বেপরোয়া শামীম ওসমানের বাড়ির কঙ্কাল। 

জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার রক্ত ঝড়ানো শামীম ওসমান, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর কয়েক দেশ ঘুরে আমেরিকায় পালিয়েছেন। হাজার হাজার মাইল দূরের শহর নিউইয়র্কে বসে আবারও ফাঁকা হুংকার দিচ্ছেন, ‘এখন খেলা নয়, এবার যুদ্ধ হবে!’ দেশে থাকা নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন শামীম ওসমান। তবে স্বস্তি নেই কোথাও। বিদেশের মাটিতে ধাওয়া খেয়ে হলরুম ছেড়ে পালাতে হচ্ছে তাকে। সময় বড় নির্মম! ক্ষমতার মঞ্চ বদলেছে, বদলে গেছে দৃশ্যপটও। শব্দ আছে, হুংকারও আছে—শুধু নেই সেই পুরোনো মাঠ, নেই সেই ভিড়, নেই খেলোয়াড়রূপী সন্ত্রাসীদের পৈশাচিক উন্মাদনা!

২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন শামীম ওসমান ও তার স্ত্রী সালমা ওসমানের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করে। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, শামীম ওসমান ক্ষমতার অপব্যবহার করে জ্ঞাত আয়ের বাইরে প্রায় ৬ কোটি ৬৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬৮৯ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এর পাশাপাশি তার নয়টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৪৩৯ কোটি ৮২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৮০ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার স্ত্রীরও প্রায় ৩ কোটি ৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং আটটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২৪৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক। শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে শুধু অবৈধ সম্পদের অভিযোগই নয়, অর্থপাচারের অভিযোগেও মামলা হয়েছে। 

নারায়ণগঞ্জের পরিবহন খাতে শামীম ওসমানের প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিলো চাঁদাবাজি। বিভিন্ন সময়ে পরিবহন মালিকের অভিযোগ ছিলো, শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানি থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করতেন তিনি। শামীম ওসমানের ছত্রচ্ছায়ায় ইব্রাহিম চেঙ্গিস ও তার সহযোগীরা বন্ধন পরিবহনের কাছ থেকে কয়েক বছরে ৭ কোটি ৯ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা চাঁদা নিয়েছেন। 

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুতর আইনি প্রক্রিয়াটি চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান এবং পরিবারের আরও কয়েকজনসহ মোট ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই এবং ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সাইনবোর্ড এলাকায় সংঘটিত সহিংসতায় ১০ জন নিহত হন। এসব ঘটনায় শামীম ওসমান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ১২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।

এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগের প্রথমটি হলো- ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার চাষাঢ়া, ফতুল্লা থানাধীন সাইনবোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিক্ষার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল, ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগ- ২১ জুলাই ফতুল্লা থানাধীন ভূইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যা করা হয়। তৃতীয় অভিযোগ- ৫ আগস্ট বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যা করার।

একসময় যে বাড়ির বাসিন্দাদের ভয় পেতো নারায়ণগঞ্জবাসী। আজ সেই ভয় নেই, নেই সেই দাপটও। পড়ে আছে শুধু একটি বাড়ি—আর তার ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি ইট যেন বলে যায়- ক্ষমতার দেয়াল যতো উঁচুই হোক, সময়ের কাছে শেষ পর্যন্ত তা ভঙ্গুর।

বিভি/এনএম/এআই

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত