• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

মানুষ সৃষ্টির সময় কেনো মাটি দিতে চায়নি জমিন?

প্রকাশিত: ১৭:৪৯, ৭ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
মানুষ সৃষ্টির সময় কেনো মাটি দিতে চায়নি জমিন?

প্রতিকী (এআই)

কেন মানুষ সৃষ্টির জন্য মাটি দিতেই চায়নি জমিন? কেন আল্লাহর আদেশ শুনে কেঁদে উঠেছিল পৃথিবী? কেন একের পর এক শক্তিশালী ফেরেশতা মাটি আনতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এলেন? আর শেষ পর্যন্ত কে নিয়ে এল সেই মাটি, যেখান থেকেই সৃষ্টি হলো মানবজাতি? মানুষ সৃষ্টির সেই শিহরণ জাগানো আদি ইতিহাসে লুকিয়ে আছে আমাদের গায়ের রঙের বৈচিত্র এবং মানুষের স্বভাবের এক অদ্ভুত দুর্বলতার কথা।

মহাবিশ্বে তখন নেই কোনো মানুষ। ঠিক সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাআলা মাটি দিয়ে মানুষ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা হজরত জিবরাইল (আ.)-কে পৃথিবী থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন, এমন বর্ণনা পাওয়া যায়।

জিবরাইল (আ.) যখন দুনিয়াতে নামলেন, তখন জমিন এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসে। সে আর্তনাদ করে বলল, ‘হে জিবরাইল, তুমি যদি আমার থেকে মাটি নিয়ে যাও, তবে আমার অঙ্গহানি হবে। আমি আল্লাহর দোহাই দিয়ে তোমার কাছ থেকে পানাহ চাই।’

আল্লাহর নামের দোহাই শুনে জিবরাইল (আ.) আর মাটি নিতে পারলেন না। তিনি খালি হাতে ফিরে গেলেন। এরপর এলেন হজরত মিকাইল (আ.)। কিন্তু মাটির এই আর্তনাদ শুনে তিনিও ফিরে গেলেন। সবশেষে আল্লাহ তাআলা পাঠালেন হজরত আজরাইল (আ.)-কে।

মাটি যখন আবারও আল্লাহর দোহাই দিয়ে মুক্তি চাইল, তখন আজরাইল (আ.) বললেন, ‘তুমি আল্লাহর দোহাই দিচ্ছ, অথচ আমি আল্লাহর আদেশ পালন করতে এসেছি। আল্লাহর নির্দেশের সামনে তোমার কান্নার কোনো মূল্য নেই আমার কাছে।’

এই বলে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাদা, কালো, লাল ও ধূসর রঙের মাটি তুলে নিলেন । এমন বর্ণনাও বিভিন্ন তাফসির ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। আর মানুষের গায়ের রঙের বৈচিত্রের সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে নেওয়া মাটির সম্পর্কের কথাও কিছু বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে জিবরাইল (আ.), মিকাইল (আ.) ও আজরাইল (আ.)-এর এই ধারাবাহিকভাবে মাটি সংগ্রহের বিস্তারিত ঘটনাটি কোরআন বা সহিহ হাদিসে এভাবে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়নি। তাই এটিকে নিশ্চিত ইসলামী তথ্যের পরিবর্তে বর্ণিত ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত।

সহিহ সূত্রে অবশ্য আদম (আ.)-এর সৃষ্টি সম্পর্কে এসেছে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র পৃথিবী থেকে নেওয়া এক মুঠো মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। সেই মাটির বৈচিত্র্যের কারণে আদম সন্তানের মধ্যে বিভিন্ন বর্ণ ও স্বভাবের বৈচিত্র্য দেখা যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে সমগ্র পৃথিবী থেকে নেওয়া এক মুঠো মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। ফলে আদম সন্তানের মধ্যে কেউ লাল, কেউ সাদা, কেউ কালো এবং কেউ এসবের মধ্যবর্তী বর্ণের হয়েছে। মানুষের স্বভাবের মধ্যেও বিভিন্ন বৈচিত্র্য রয়েছে। (জামে তিরমিজি: ২৯৫৫; সুনান আবু দাউদ: ৪৬৯৩/৪৬৯৪ )

এরপর আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-এর অবয়ব তৈরি করেন। কোরআনে তাঁর দেহ পূর্ণাঙ্গ করার পর তাতে রুহ প্রদান করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন আমি তাকে পূর্ণাঙ্গ করব এবং তাতে আমার রুহ থেকে ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সামনে সিজদাবনত হও।’(সূরা আল-হিজর: ২৯)

অবশেষে সেই সময় এলো, যখন আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-এর দেহে রুহ প্রদান করলেন। হাদিসের একটি বর্ণনায় এসেছে, রুহ প্রবেশ করার পর আদম (আ.) হাঁচি দেন এবং বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ আল্লাহ তাআলা তাঁর জবাব দেন এবং তাঁর প্রতি রহমত করেন। (জামে তিরমিজি: ৩৩৬৮)

“তাফসিরে বর্ণিত একটি বর্ণনা অনুযায়ী, আদম (আ.)-এর দেহে রুহ প্রবেশ করার সময় রুহ প্রথমে মাথায় পৌঁছায়। এরপর চোখে পৌঁছালে তিনি জান্নাতের ফল দেখতে পান এবং পেটে পৌঁছালে খাবারের আকাঙ্ক্ষা জাগে। রুহ পায়ে পৌঁছানোর আগেই তিনি জান্নাতের ফলের দিকে ছুটে যেতে চেয়েছিলেন। তবে এ বিস্তারিত বর্ণনাটি সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়; তাফসিরগ্রন্থগুলোতে এটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং এর কিছু অংশ ইসরাইলিয়াত হিসেবে বিবেচিত।”

তবে মানুষের তাড়াহুড়াপ্রবণতার কথা পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবেই এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ তো সৃষ্টিগতভাবেই তাড়াহুড়াপ্রবণ।’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৩৭)

আজ আমরা আমাদের সেই আদি পিতার বংশধর হিসেবে মানুষের এই স্বভাবের নানা প্রকাশ দেখতে পাই। আমরা ব্যবসায় দ্রুত ধনী হতে চাই, চাকরিতে রাতারাতি পদোন্নতি চাই, অল্প সময়ে সফল হতে চাই। সবকিছুতেই আমাদের বড্ড তাড়াহুড়া।

কিন্তু মানুষের সৃষ্টি ও স্বভাবের এই ইতিহাস আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। আমাদের শেকড় এই মাটিতেই। তাই অহংকারের কোনো কারণ নেই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ার বদলে ধৈর্য, সংযম এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা জরুরি।

তথ্যসূত্র
•    পবিত্র কোরআন: সূরা আল-মুমিনুন: ১২; সূরা আল-হিজর: ২৬-২৯; সূরা আর-রহমান: ১৪; সূরা আর-রূম: ২২; সূরা আল-আম্বিয়া: ৩৭।
•    জামে তিরমিজি: ২৯৫৫  আদম (আ.)-কে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে নেওয়া মাটি দিয়ে সৃষ্টির বর্ণনা।
•    সুনান আবু দাউদ: ৪৬৯৩/৪৬৯৪   আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ও মানুষের বৈচিত্র্য।
•    জামে তিরমিজি: ৩৩৬৮   আদম (আ.)-এর হাঁচি ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার বর্ণনা।

বিভি/এনএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত