অজান্তেই গীবত করছেন না তো? প্রতিদিনের যেসব ভুলে হচ্ছে গুনাহ
ছবি: সংগৃহীত
মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অন্যের দোষ তুলে ধরা, বন্ধুর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা কিংবা কারও অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা; এসব অনেকেই সাধারণ কথাবার্তা মনে করেন। অথচ এমন কথার মধ্যেই থাকতে পারে গীবত, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। শুধু কাউকে অপমান করার উদ্দেশে নয়, সত্য কথা বলেও একজন মানুষ গীবতের গুনাহে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
গীবত কী, কোন কথাগুলো গীবতের মধ্যে পড়ে এবং অজান্তে এই গুনাহ হয়ে গেলে করণীয় কী, জেনে নেওয়া যাক ইসলামের আলোকে।
গীবত বলতে কী বোঝায়?
গীবত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা কি জানো, গীবত কী?’
সাহাবিরা বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বলেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’
জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তাহলে কী হবে? তিনি বলেন, ‘তুমি যা বলছো, তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলে তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তা তার মধ্যে না থাকে, তাহলে তুমি তার প্রতি অপবাদ দিলে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)
অর্থাৎ, কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ বা বিষয় উল্লেখ করা, যা তিনি জানতে পারলে অপছন্দ করবেন, তা গীবত হতে পারে। বিষয়টি সত্য হলেও গীবত থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। আর মিথ্যা দোষ আরোপ করা আরও গুরুতর অপরাধ।
গীবত সম্পর্কে কোরআনের কঠোর সতর্কবার্তা
পবিত্র কোরআনে গীবত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আর তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো একে ঘৃণাই করো।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)
এই আয়াতে গীবতের ভয়াবহতা বোঝাতে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার উপমা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানুষের সম্মানহানি ও পরনিন্দার নিন্দনীয় দিকটি স্পষ্ট করেছেন।
প্রতিদিনের কোন কাজগুলো গীবত হতে পারে?
অনেক সময় মানুষ স্বাভাবিক কথাবার্তার মধ্যেই গীবতে জড়িয়ে পড়েন। যেমন:
বন্ধুদের আড্ডায়: কোনো বন্ধুর ব্যক্তিগত দুর্বলতা, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অতীতের ভুল নিয়ে তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করা।
কর্মক্ষেত্রে: সহকর্মীর ব্যক্তিগত দোষ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা করা কিংবা তার অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলা, যা তিনি শুনলে কষ্ট পাবেন।
হাসি-ঠাট্টায়: কারও শারীরিক গঠন, উচ্চারণ, পোশাক বা ব্যক্তিগত দুর্বলতা নিয়ে উপহাস করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে: কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটাক্ষ করা, অপমানজনক মন্তব্য ছড়ানো কিংবা ব্যক্তিগত কথোপকথন প্রকাশ করে তাকে হেয় করা।
তবে সব ধরনের সমালোচনা বা কারও বিষয়ে কথা বলাই গীবত নয়। অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া, প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়া কিংবা কাউকে ক্ষতি থেকে সতর্ক করার মতো বৈধ প্রয়োজন থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, প্রয়োজন ও বক্তব্যের সীমা বিবেচনা করা জরুরি।
গীবত করলে কি নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়?
গীবত মানুষের সম্মান ও অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ গুনাহকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কিয়ামতের দিন মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের বিচার হবে, এ বিষয়ে হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তির কথা বর্ণনা করেছেন, যে নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু দুনিয়ায় কাউকে গালি দিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে কিংবা অন্যের ওপর জুলুম করেছে। তখন তার নেক আমল ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপানো হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১)
এই হাদিস মানুষের হক নষ্ট করার ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরে। তাই গীবতসহ অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে এমন কাজ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব।
অজান্তে গীবত হয়ে গেলে কী করবেন?
গীবত হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আন্তরিকভাবে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
১. গীবত বন্ধ করুন: কারও দোষ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা শুরু হলে তা থামিয়ে দিন।
২. আল্লাহর কাছে তওবা করুন: নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হন, ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার সংকল্প করুন।
৩. যার সম্পর্কে বলেছেন, তার সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট হোন: তার সম্পর্কে ছড়ানো ভুল তথ্য সংশোধন করুন এবং যেখানে তার সম্মানহানি করেছেন, সেখানে সম্ভব হলে তা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন।
৪. ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করুন: সরাসরি জানালে যদি নতুন করে কষ্ট বা বড় ক্ষতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে কীভাবে সংশোধন করা উচিত, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন। এ বিষয়ে আলেমদের বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে; সব পরিস্থিতিতে একই পদ্ধতি প্রযোজ্য নয়।
৫. কথা বলার আগে ভাবুন: কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষ বলার প্রয়োজন আছে কি না, কথাটি ন্যায়সংগত কি না এবং এতে অকারণে কারও সম্মানহানি হচ্ছে কি না, তা বিবেচনা করুন।
গীবত থেকে বাঁচার সহজ উপায়
গীবত এড়াতে নিজের কথাবার্তার প্রতি সচেতন হতে হবে। আড্ডায় অন্যের দোষ নিয়ে আলোচনা শুরু হলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত আলোচনা এড়িয়ে চলা এবং কারও দুর্বলতা প্রকাশ না করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অন্যের ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্য থাকলে তা যেন অপমান বা বিদ্বেষের কারণ না হয়। প্রয়োজনীয় কথা বলার ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার, সংযম ও সদিচ্ছা বজায় রাখা উচিত।
বিভি/এনএইচ













মন্তব্য করুন: