পরিবারে বরকত ও শান্তি আনতে যে আমলগুলো করবেন
ছবি: সংগৃহীত
প্রত্যেকেই চান, সংসারে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানসিক প্রশান্তি বজায় থাকুক। কিন্তু নানা কারণে অনেক পরিবারে অশান্তি, মনোমালিন্য ও সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়। ইসলামে পরিবারে শান্তি ও বরকত লাভের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা বলা হয়েছে। নিয়মিত এসব আমলের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উত্তম আচরণ ও আল্লাহর প্রতি ভরসা থাকলে সংসার হয়ে উঠতে পারে আরও সুন্দর।
১. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা
পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তোলার অন্যতম উপায় হলো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। পরিবারের সদস্যদের নামাজের প্রতি যত্নবান হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার পরিবারকে নামাজের আদেশ দাও এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকো।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১৩২)
২. ঘরে কোরআন তিলাওয়াত করা
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ঘরে আল্লাহর স্মরণকে জীবন্ত রাখে। তাই প্রতিদিন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত ও দ্বীনি আলোচনা করা যেতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। যে ঘরে সুরা বাকারা পাঠ করা হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮০)
৩. ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেওয়া এবং ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যখন ঘরে প্রবেশ করবে, তখন নিজেদের লোকদের প্রতি সালাম করবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ (সুরা আন-নুর, আয়াত: ৬১)
৪. পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা
পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে একে অপরের প্রতি সহনশীল ও সদয় হতে হবে। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)
৫. বেশি বেশি আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফার করা
পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফারের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং তার স্মরণে সময় কাটানো মুমিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)
৬. হালাল উপার্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া
পরিবারে বরকত লাভের জন্য হালাল উপার্জনের বিকল্প নেই। জীবিকার ক্ষেত্রে হারাম ও সন্দেহজনক উপার্জন থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য হালাল পথে চেষ্টা করা প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তির কর্তব্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৮)
৭. পরিবারের জন্য নিয়মিত দোয়া করা
পরিবারের শান্তি, কল্যাণ ও নেক সন্তান লাভের জন্য কোরআনে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া নিয়মিত পড়া যেতে পারে।
দোয়া:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ: রাব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিও ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখ জুড়ানো প্রশান্তি দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন। (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪)
৮. রাগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমার অভ্যাস গড়ে তোলা
সংসারে ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে। তবে রাগের মাথায় কটু কথা বলা, অপমান করা কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করার মতো আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। একে অপরের ভুল ক্ষমা করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের গুণ বর্ণনা করে বলেন, ‘যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)
৯. পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে ইবাদত করা
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জামাতে নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি আলোচনা ও দোয়ার পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে। এতে সন্তানদের মধ্যেও ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি রাতে জেগে নিজে নামাজ পড়ে এবং তার স্ত্রীকেও জাগায়, অতঃপর উভয়ে নামাজ আদায় করে, তখন তাদের উভয়কে অধিক জিকিরকারী নারী-পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩০৯)
পরিবারে বরকত ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু কিছু আমল করাই যথেষ্ট নয়; বরং এর পাশাপাশি হালাল উপার্জন, দায়িত্বশীলতা, পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও ক্ষমাশীলতার চর্চাও জরুরি। পরিবারের প্রত্যেক সদস্য নিজের দায়িত্ব পালন করলে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের লক্ষ্য বানালে সংসারে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা সহজ হয়।
বিভি/এনএইচ













মন্তব্য করুন: