লন্ডনে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান কাল
ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে ৪ মহাতারকা, পরিসংখ্যানে এগিয়ে কে?
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা। সোমবারের (২৬ অক্টোবর) অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হবে ২০২৬ সালের বিজয়ীর নাম। গত মৌসুমে গোলের বন্যা বইয়ে দেওয়া ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন রয়েছেন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসিও রয়েছেন আলোচনায়। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলীয় সাফল্য ও গোলের পরিসংখ্যান- সব মিলিয়ে এবার কে জিতবেন ব্যালন ডি’অর, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
পুরুষদের ব্যালন ডি’অরের জন্য এবার ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। এতে রয়েছেন আগের তিন বিজয়ী- ২০২৫ সালের ওসমান দেম্বেলে, ২০২৪ সালের রদ্রি এবং রেকর্ড আটবারের বিজয়ী মেসি। তবে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন চার ফুটবলার- কেইন, ইয়ামাল, এমবাপ্পে ও মেসি।
বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার। বিশ্বকাপের বছরে সাধারণত বিশ্বকাপজয়ী বা চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী দলের খেলোয়াড়েরা পুরস্কার জয়ের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পান। সেই হিসাবে কেইনের সামনে চ্যালেঞ্জ থাকলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত।
বায়ার্ন মিউনিখ চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে উঠেছিল। অন্যদিকে কেইনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডও বিশ্বকাপের শেষ চারে পৌঁছায়। দুই প্রতিযোগিতাতেই দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৪ গোল করেন কেইন, যা এমবাপ্পের ১৫ গোলের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ছয়। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল করেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলা কোনো ফুটবলার এক মৌসুমে এর চেয়ে বেশি গোল করতে পারেননি- শুধু লিওনেল মেসি ২০১১-১২ মৌসুমে করেছিলেন ৭৩ গোল। বুন্দেসলিগায় কেইনের গোলসংখ্যা ৩৬, যার সুবাদে দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জেতেন তিনি।
বায়ার্নকে বুন্দেসলিগার শিরোপা জেতাতেও বড় ভূমিকা রাখেন কেইন। দলটি দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৬ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে লিগ শেষ করে এবং জেতে জার্মান কাপও।
কেইন ব্যালন ডি’অর জিতলে তা হবে ইংলিশ ফুটবলের জন্যও বড় অর্জন। ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর আর কোনো ইংলিশ ফুটবলার এই পুরস্কার জেতেননি। এর আগে ইংল্যান্ডের হয়ে পুরস্কারটি জিতেছিলেন কেভিন কিগান (১৯৭৮ ও ১৯৭৯) এবং ববি চার্লটন (১৯৬৬)।
টটেনহ্যাম ছেড়ে বায়ার্নে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে তার ক্যারিয়ারে সাফল্য এনে দিয়েছে, ব্যালন ডি’অর জয় সেটিরই বড় স্বীকৃতি হতে পারে।
কেইনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বার্সেলোনা ও স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালকে। বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের সদস্য হওয়ায় ভোটারদের কাছে তার বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে। তবে বিশ্বকাপে স্পেনের সাফল্যে ইয়ামালের ব্যক্তিগত অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটিও বিবেচনায় আসবে।
বিশ্বকাপে আট ম্যাচে মাত্র এক গোলে অবদান রাখেন ইয়ামাল। সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেনের ৪-০ গোলের জয়ে ম্যাচের প্রথম গোলটি করেন তিনি। তবে ক্লাব ফুটবলে তার পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ।
২০২৫-২৬ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৪ গোল করেন এবং ১৭ গোলে সহায়তা করেন ইয়ামাল। অর্থাৎ, ৪১ গোলে সরাসরি অবদান ছিল তার। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।
তুলনা হিসেবে বলা যায়, মেসি প্রথমবার এক মৌসুমে ৪১ গোলে অবদান রাখার কৃতিত্ব অর্জন করেন ২০০৮-০৯ মৌসুমে, তখন তাঁর বয়স ছিল ২১ বছর।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ২০ বছরের কম বয়সী খেলোয়াড়দের মধ্যে ইয়ামালের চেয়ে বেশি গোলে অবদান রাখতে পারেননি কেউ। লা লিগায় তার ১৭টি অ্যাসিস্ট ছিল সর্বোচ্চ। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১১৮টি সুযোগ তৈরি করেন তিনি, যা স্পেনের শীর্ষ লিগে অন্য কারও চেয়ে বেশি। ওপেন প্লে থেকে সুযোগ তৈরিতেও ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে এগিয়ে ছিলেন ইয়ামাল।
বিশ্বকাপে নিজের সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে না পারলেও বার্সেলোনার হয়ে তার ধারাবাহিকতা ও অসাধারণ নৈপুণ্য উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এবার পুরস্কার না জিতলেও ভবিষ্যতে ব্যালন ডি’অর জয়ের অন্যতম দাবিদার হয়ে উঠবেন এই তরুণ।
রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেও ব্যালন ডি’অর জয়ের শক্তিশালী দাবিদার। বিশ্বকাপে ফ্রান্স শিরোপা জিততে পারলে পুরস্কারটি জয়ের দৌড়ে তিনি আরও এগিয়ে থাকতেন। তবে সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৬-৪ গোলে হেরে যায় ফ্রান্স।
তবু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে উজ্জ্বল ছিলেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে ১০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি- দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার চেয়ে দুই গোল বেশি। একাধিক বিশ্বকাপ গোল্ডেন বুট জেতা প্রথম খেলোয়াড়ও হয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২-এ। এর মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনেও জায়গা করে নিয়েছেন এমবাপ্পে।
ক্লাব ফুটবলেও দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন এই ফরাসি তারকা। ২০২৫-২৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় ২৫ এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৫ গোল করেন তিনি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৪ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ৪২।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে অন্তত ১ হাজার ৫০০ মিনিট খেলা ফুটবলারদের মধ্যে পেনাল্টি ছাড়া প্রতি ৯০ মিনিটে গোলের হিসাবে কেইন এগিয়ে ছিলেন। তবে পেনাল্টি ছাড়া প্রত্যাশিত গোলের (এক্সপেক্টেড গোল বা xG) হিসাবে এমবাপ্পে ছিলেন কেইনের চেয়ে এগিয়ে।
ব্যক্তিগতভাবে অসাধারণ মৌসুম কাটালেও রিয়াল মাদ্রিদ দল হিসেবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। সুপারকোপা ছাড়া বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি তারা। ক্লাবের এই ব্যর্থতা এমবাপ্পের ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী লিওনেল মেসি কি নবমবারের মতো এই পুরস্কার জিততে পারবেন? সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এবার তাঁর পক্ষে আবেগও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেসি। এরপর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। ৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, তিনি এখনো বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন।
উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রধান ভরসা ছিলেন মেসি। আট গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে আরও চারটি গোল করান তিনি। তার চেয়ে বেশি গোলে অবদান ছিল কেবল এমবাপ্পের—১৪টি।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ২৫টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন মেসি। প্রত্যাশিত অ্যাসিস্টের হিসাবেও ৪.১৫ নিয়ে ছিলেন সবার ওপরে। তবে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।
ক্লাব ফুটবলেও দারুণ কার্যকর ছিলেন মেসি। ইন্টার মায়ামির হয়ে মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) মাত্র ৩০ ম্যাচে ৫২ গোলে অবদান রাখেন তিনি। এর মধ্যে ২৯ গোল এবং ২৩টি অ্যাসিস্ট রয়েছে। ওই সময়ে লিগে গোল ও অ্যাসিস্ট- দুই বিভাগেই শীর্ষে ছিলেন মেসি। পাশাপাশি পুরো লিগে সর্বোচ্চ ৯৭টি এবং ওপেন প্লে থেকে ৭৮টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন তিনি।
তবে এমএলএসের পারফরম্যান্স ব্যালন ডি’অরের ভোটে ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর মতো গুরুত্ব পায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বকাপে মেসির অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে আলোচনায় রাখলেও আর্জেন্টিনার শিরোপা না জেতা তার সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
চার তারকার পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে হ্যারি কেইনকেই এগিয়ে রাখার যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী। এক মৌসুমে ৬১ গোল, বুন্দেসলিগার শিরোপা এবং ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি- সব মিলিয়ে ব্যক্তিগত অর্জনে তিনি অনন্য।
অন্যদিকে, বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের সদস্য হিসেবে ইয়ামাল বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। এমবাপ্পের বিশ্বকাপে ১০ গোল এবং ক্লাব পর্যায়ে ধারাবাহিক গোল করার কৃতিত্বও তাকে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। আর মেসির অভিজ্ঞতা, বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফরম্যান্স ও অতীতের অর্জন তাকে আলোচনার বাইরে যেতে দিচ্ছে না।
তবে দলীয় শিরোপা, ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান এবং ভোটারদের বিবেচনা- সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে ব্যালন ডি’অর, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য।
সূত্র: অপ্টা অ্যানালিস্ট
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: