• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

শিশু বয়সে বাবা হারা রুপ্না ও ঋতু`র চ্যাম্পিয়ন হবার লড়াই

নন্দন দেবনাথ, রাঙ্গামাটি

প্রকাশিত: ১৪:৩১, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২

ফন্ট সাইজ
শিশু বয়সে বাবা হারা রুপ্না ও ঋতু`র চ্যাম্পিয়ন হবার লড়াই

সংগৃহীত ছবি

গত সোমবার কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-নেপালের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবারের মতো শিরোপার জয় লাভ করে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। আর এই দলেই রয়েছে দূর্গম এলাকার রাঙ্গামাটি কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়িতে ঋতু পর্ণার বাড়ি ও নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ভূয়ো আদামে বাসিন্দা রুপ্না চাকমার বাড়ি। 

শিরোপা জয়ের আনন্দের বাড়তি ঢেউ লেগেছে রাঙ্গামাটি দুই পাহাড়ি গ্রামের মানুষদের। এমন দুর্দান্ত জয়ে গোটা দেশে আনন্দ উল্লাস। অতিদরিদ্র পরিবারের নারী হয়েও তাদের অদম্য ইচ্ছা শক্তিতে তার সাফল্যতে তার মা-সহ গ্রামের লোকজন গর্বিত। রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ে বেড়ে ওঠা নারী সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক রুপ্না চাকমা ও ফুটবলার ঋতুর্পনা চাকমা। দক্ষিণ এশিয়া শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক হওয়ায় রুপ্না চাকমা আর সেরা ফুটবলার ঋতুর্পনা চাকমা দুইজনই এখন বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করছেন আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে। আর তাই এই দুই দূর্গম এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে চলছে আনন্দ উৎসব। রুপ্ন চাকমার মা ও বোন যেন আন্দনে আত্মহারা।

রুপনা চাকমার উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট। কিন্তু এই উচ্চাতা দিয়েই দুর্দান্তভাবে গোল পোস্ট সামলে যাচ্ছেন রুপনা। এবারের সাফে তার হাত ফাঁকি দিয়েছে মাত্র একবার। দারুণ এই কীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জিতেছেন রাঙামাটি থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার। রুপনার গায়ে এখন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষকের ট্যাগ। 

তবে তার বাড়ির চিত্র দেখলে বোঝার উপায় নেই যে, সেটি দিক্ষণ এশিয়ার সেরা গোল রক্ষকের বাড়ি। বাঁশ, চাটাই আর টিনের তৈরি বাড়িটি কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। একটিমাত্র কক্ষে চলে সব কাজ। নিজের বাড়ির এমনি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছেন রুপনা চাকমা। তবে শিরোপা জয়ের পর বাড়ির ব্যবস্থাওহচ্ছে তার। পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হওয়ার পর রুপ্না চাকমা বাবা মারা যান। তাদের মা অতি দরিদ্রতার সাথে লড়াই করে তাদের কষ্টের মধ্যদিয়ে বড় করে তোলেন।

 

এদিকে ঠিক জন্মের পরে না হলেও শিশু বয়সেই বাবাকে হারান ঋতুপর্ণাও। গত জুনে ভাই পার্বন চাকমাকেও হারান ঋতুপর্ণা। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার মোগাছড়ি গ্রামে কলেজ থেকে ফিরে গোসল করতে গিয়েছিলেন ঋতুপর্ণার ভাই পার্বন চাকমা। সেখানেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারাযায় ১৬ বছর বয়সী পার্বন।

ভাই পার্বন চাকমার সঙ্গে ঋতুপর্ণার

তবে রুপ্না ও ঋতু'র ছোট বেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল প্রচন্ড ঝোক। ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির পর তাদের অদম্য শক্তি ও পরিশ্রমে আর্ন্তজাতিক অনূর্ধ্ব-১৯ নারী দলে ডাক পান রূপনা ও ঋতুপর্ণা। এরপরই তাদের নামটি ইতিহাস হয়ে গেলো মন্তব্য করেন তাদের প্রথাম কোচ শান্তিমনি চাকমা। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ে নিয়মিত মেয়েদের ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অনুর্ধ্ব–১৯ নারী সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে জয়ী বাংলাদেশ দলের পাঁচজনই এই বিদ্যালয় থেকে এসেছেন।

রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয়ে নিয়মিত মেয়েদের ফুটবলের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অনুর্ধ্ব–১৯ নারী সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে জয়ী বাংলাদেশ দলের পাঁচজনই এই বিদ্যালয় থেকে এসেছেন।

রাঙ্গামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শফিউল আজম বলেন, বাংলাদেশের এ জয়ে সারাদেশের মানুষের মতো আমরাও গর্বিত। আমরা চাই রাঙ্গামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে আরো বেশী পার্বত্য এলাকায় খেলোয়াড় গড়ে উঠুক। তাই আমরাও চাই পার্বত্য এলাকায় খেলোয়াড় সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসুক।

গত মঙ্গলবার রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এই দুই কৃতি ফুটবলার ঋতুর্পনা চাকমা ও রূপনা চাকমার গ্রামের বাড়ী যান। এসময় দুই ফুটবলার পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে ৩ লাখ টাকা উপহার তুলে দিয়ে বলেন, সাফ চ্যাম্পিয়নশীপে রূপনা ও ঋতুপর্ণা তারা অসাধারন খেলার নৈপূণ্য দেখিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম কুড়িয়েছে। রূপনা ও ঋতুপর্ণা আজ পুরো জাতির গর্ব। আমরা তাদের নিয়ে গর্বিত। তাদের পরিবারের পাশে আমরা আছি থাকব।

সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে খেলা রাঙ্গামাটির দুই ফুটবলার রিতুপর্ণা চাকমা ও রুপনা চাকমার বাড়িতে গিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এসময় তিনি উভয় পরিবারকে দেড় লাখ করে মোট তিন লাখ টাকা পুরস্কার দিয়েছেন।

পার্বত্য এলাকায় সরকারী ভাবে পৃষ্টপোষকতা পেলে রূপনা ও ঋতুপর্ণার মতো আরো বেশী খেলোয়াড় সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় পর্যায়ে দেশের সুনাম অর্জন বয়ে আনতে বলে এমনটা প্রত্যাশা ক্রীড়াপ্রেমিদের। 
 

মন্তব্য করুন: