গোয়েন্দাভিত্তিক এক গ্রন্থ: ‘ব্রাউন পেপার’
রশিদ কোরেশি। ডেভেলপার ব্যবসা। ব্যবসায় কারণে হোক বা চারিত্রিক স্থলনজনিত কারণে হোক তার শত্রুর অভাব ছিলো না। তিন জনের সংসার। সুন্দরী স্ত্রী আনিকা রশিদ। বয়স ৪০ কী ৪২। তাদের একমাত্র মেয়ে- নাম সিমিন। বয়স ১০ বা ১২ বছর। তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিলো না, প্রায়ই ঝগড়া-ঝাটি লেগে থাকত। রশিদ কোরেশি নিজ বাসায় এক তলায় খুন হয়। খুন হয়েছে রাত আনুমানিক সাড়ে দশটা থেকে পৌনে বারোটার মধ্যে। বাসা পশ্চিম রাজারবাগ ইন্দিরা রোডে। আনিকা রশিদই সাতসকালে ফোন করেছেন ডিটেকটিভ অলোকেশ রয়কে। সেই সূত্রে ধরে শুরু খুনের রহস্য উদঘাটনের।
অলোকেশ রয় প্রায়ইশঃ বলেন কোন ঘটনা উদঘাটনের জন্য ফার্স্ট ইনফরমেশন রির্পোট ইজ মোস্ট ইমপর্ট্যান্ট ইন এনি কেস। খুনি কে? স্পটে হাজির হয় অলোকেশ রয়, আর্কিটেক্ট উর্বী ও রির্পোটার শুভ্র ও ইন্সপেক্টর মামুন শরিফ। তারা ঘটনাস্থল গিয়ে দেখেন লাশ বিছানায় পড়ে আছে, যেন ঘুমাচ্ছেন তিনি। পায়ে জুতা। গলায় বৃত্তকার কাটা দাগ ছাড়া সারা গায়ে আর কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তার মানে এটা ঠান্ডা মাথার খুন। মার্ডার ওয়েপন? পেপার নাইফ বা অ্যান্টি-কাটার। কিন্তু পেপার নাইফ দিয়ে খুন? ভিকটিমের সাথে খুনির কোনো রকম ধস্তাধস্তি বা হাতাহাতি হয়নি। মাস্টারবেড প্রায় অক্ষত। বিছানায় ঘষামাজা বা ভাঁজ নেই কোনো। দেখে মনে হয় ভিকটিমকে অন্য কোথাও মেরে তারপর বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। পেশাদার খুনী না। কারণ পেশাদার খুনি হলে লাশ এভাবে বিছানায় উপর রাখবে না। এভাবে অলোকেশ রয় খুনের মূল রহস্য খুঁজতে থাকে।
ভিকটিমের দরজা ইয়েল-লক সিস্টেম। অর্থাৎ ঢুকতে গেলে এই দরজার চাবির দরকার পড়ে, কিন্তু লক করে বেরিয়ে যেতে চাবি লাগে না। ওটা আপন-আপনিই লক হয়ে যায়। কিন্তু ইয়েল-লক কাজ করেছিলো না, উর্বীই তা আবিষ্কার করলেন। আলামত হিসেবে যা পাওয়া গেছে তা দিয়ে খুনিকে ধরা সহজ হবে না। ডিটেকটিভ অলোকেশ রয় ঘটনার ততো গভীরে যায়, তত ঘটনা গোলমালে মনে হয় তাদের কাছে।
তাদের তদন্তে সন্দেহের তালিকায় নাম উঠে আসে কখনও পরকীয়া জনিত কারণে স্ত্রী আনিকা রশিদের প্রেমিক আবদুল কাদেরের। কারণ, আনিকা রশিদ ও রশিদ কোরেশির মধ্যে প্রায় ঝগড়া-ঝাড়ি লেগে থাকতো। আনিক রশিদ নিজেই স্বামীকে খুন করেছেন না তো? কারণ স্বামী খুন হয়েছে এতে তার কোনো বিন্দুমাত্র শোক তাপ নাই। তার চেহারায় কোন অস্বাভাবিকতা নাই। যে কেউ দেখে বললে এটা আনিকা রশিদই করিছে। অন্য কোনো পুরুষের সাথে পরকীয়া আছে। তাই স্বামীকে খুন করছেন। কিন্তু কী করে তা সম্ভব! ফরেনসিক রির্পোট অনুযায়ী রশিদ কোরেশি যখন খুন হয়েছে রাত দশটা থেকে পৌনে বারোটার মধ্যে। তখন তো আনিকা রশিদ বাসায় ছিলো না। আনিকা রশিদ ছিলেন তার বান্ধবী জেসিকা বাসায় জন্মদিন পার্টিতে। আনিকা রশিদ যখন বাসায় ফিরে আসে তখন রাত সাড়ে এগারটা বা পৌনে বারোটা বাজে। আনিকা রশিদ ফিরে এসে দরজায় নক করে ভেতর থেকে বন্ধ পায়। সে কয়েক বার টোকা দেয়, কিন্তু দরজা খোলে না রশিদ। আনিকা রশিদ ভাবল হয়ত ঘুমাচ্ছে। বিরক্ত না করি। কারণ তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিলো এতো গভীর ছিলো যে স্বামীর রুমে যেতে হলে দরজায় টোকা দিয়ে যেতে হতো।
অলোকেশ রয় কখনও সন্দেহ করে রশিদ কোরেশির ব্যবসায় পার্টানারকে দিয়ে। সে কি খুন করল রশিদ কোরেশিকে? কিন্তু পোস্ট মর্ডেম রির্পোটের বরাত অনুযায়ী খুনী নাকি একজন মেয়ে। তাই পিএম রির্পোট পুনরায় করায় অলোকেশ রয়। কখনও অলোকেশ রয় সন্দেহ করে সিমিনের গৃহশিক্ষিকা উর্মীবে দিয়ে? মেয়ে মানুষ কীভাবে খুন করবে? কিন্তু উর্মী কেন খুন করবে। মোটিভ কী। উর্মী সে রাতে সিমিনকে পড়িয়ে সিমিনকে ডিনার করিয়ে রাত দশটার দিকে বাসা থেকে চলে যায় এমনটা জানাল উর্মী অলোকেশ রয় ও তার তদন্ত দলকে। কিন্তু মেয়ে মানুষ কিভাবে একটা পুরুষকে খুন করবে। মেয়ে মানুষের চেয়ে তো পুরুষের শক্তি বেশি থাকে। এছাড়া বিছানায় কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নাই।
অলোকেশ রয়ের কখনও সন্দেহ হয় বাড়ির দাড়োয়ান বান্টিকে দিয়ে। কিন্তু বান্টি খইনি খায়। সে কী করে খুন করবে। এভাবে দিন যতো যায় সন্দেহ তালিকা তত বড় হয়। কিন্তু কোন প্রমান পায় না অলোকেশ রয়। পুরো ঘটনা নিয়ে মহাসমুদ্রে পড়ে যায় অলোকেশ রয়। কিন্তু খুনির অসাবধানতায় হোক বা খামখেয়ালীপনায় হোক খুনের কিছু আলামত তো অলোকেশের নজরে পড়বেই। কারণ অলোকেশ রয় ভাল করেই জানে ঘটনার কোনো সূত্র তো পাওয়া যাবে। রশিদ কোরেশির মোবাইলটি পাওয়া যায়নি। তার মানে খুনি হত্যা করে মোবাইল ফোনটি সঙ্গে করে নিয়ে যায়। ফরেনসিক রির্পোট অনুযায়ী রশিদ কোরেশির গলায় ডান পাশে ভারী কাটার চিহৃ রয়েছে। তাহলে রশিদ কোরেশি কি লেফট হান্ডেড ছিল? কিন্তু অলোকেশ রয় এখন কিভাবে জানবে? রশিদ কোরেশি তো খুন হয়েছে। অলোকেশ রয় ও তার দল দ্বিতীয়বার স্পটে আলামতের জন্য প্রবেশ করে। এবার নতুন একটা আলামত সংগ্রহ করেন অলোকেশ রয় ও তার দল। ব্রাউন পেপার। তার গায়ে লেখা জে.এন্ড.কো। আগেবার ছায়ার কারনে অলোকেশ রয়ের নজরে পড়েনি। এদিকে অলোকেশ রয় বুঝে ফেলে যেহেতু খুনি একজন মেয়ে, সেহেতু যথা সম্ভব সকল সন্দেহ মেয়ের পিছনে গোয়েন্দা নজরদারিত্ব রাখা। তার মধ্যে অন্যতম ছিলো গৃহশিক্ষিকা উর্মী। উর্মী কোথায় থাকে, কার কার সাথে চলাফেলা করে এসব নজরদারি করার জন্য লোক সেট করে দেয়। একদিন উর্বী ও শুভ্রকে উর্মীর বাসায় পাঠায় তদন্তের জন্য। সেদিন উর্মীকে পায় না। উর্বী ও শুভ্র উর্মীর বাসায় গিয়ে কিছু ব্রাউন পেপার ও ল্যাভেন্ডারের বডি স্পে পায় আর সাথে কিছু টাকা ও ব্যাংক হিসাব বিবরণী। এবার অলোকেশ রয় আসল কাজটি করে ফেললো। এবং বুঝতে বাকী রইলো না, খুনি কে? কিন্তু এখনও তো প্রমান নাই অলোকেশ রয়ের কাছে। তবে যা পাওয়া গেছে তাতেই অলোকেশ রয়ের জন্য যথেষ্ট। এই ল্যাভেন্ডারের গন্ধও স্পটে আলামত হিসেবে যে ব্রাউন পেপার পাওয়া গিয়েছিল তাতেও পাওয়া গিয়েছিলো।
অন্যদিকে ঐদিনই ভিকটিমের মোবাইলটি খোলা পাওয়া যায়। ইন্সপেক্টর মামুন শরিফের কাছে থাকা ভিকটিমের নাম্বার ট্যাকিং করে জানা যায় মোবাইলটির লোকেশন বসুন্ধরা সিটির আট তলায়। সেখানে গিয়ে শায়লা নামে এক মেয়ের কাছে মোবাইলটি পাওয়া যায়। শায়লা হচ্ছে সেই গৃহশিক্ষিকা উর্মীর বাসায় সাবলেটে থাকে। টিম হাজির হয় বসুন্ধরা সিটিতে। শায়লাকে আটক করে। শায়লা জানায় সে মোবাইলটি উর্মীর বাসা থেকে চুরি করেছে।
এভাবে পুরো ঘটনার জট আস্তে আস্তে খুলতে থাকে। একদিকে শায়লা গ্রেপ্তার হলো। অন্যদিকে ব্রাউন পেপারের সাথে খুনীর ফিঙ্গারপ্রিন্টও মিল পাওয়া গেল। তার মানে খুনী উর্মী। এখানেই শেষ নয়। কেন খুন করল উর্মী! উর্মী জানায় রশিদ কোরেশি উর্মীর বাবাকে ঠকিয়েছে। উর্মীর বাবা রশিদ কোরেশিকে ব্যাংক থেকে লোন করে টাকা দিয়েছিল একটি ফ্ল্যাট পাওয়ার জন্য। কিন্তু রশিদ কোরেশি তা উর্মীর বাবাকে বুঝিয়ে দেয় নি। এতে তার পুরো পরিবার রাস্তায় বসতে বাধ্য হয়। সেই রাগ থেকে এই খুন। এই খুন উর্মী একা করার সাহস পেলো কী করে? আদতে কি সে একা করেছে। না। অলোকেশ রয় ব্রাউন পেপারের গাযে লেখা ব্র্যান্ডের নাম ধরে একটি ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে। সেই ভিভিওতে দেখা যায় জেকব ডি ক্রুজ নিজে ব্রাউন পেপারে করে নাইফটি উর্মীকে সরবরাহ করে। জেকব হচ্ছে জেসিকার স্বামী। রশিদ কোরেশির কারণে জেসিকা জেকবকে ডির্ভোস দিয়েছিলো। কিন্তু জেসিকাকে বিয়ে করেনি। জেকব বিষয়টি জানতে পারে। এবং সেই রাগের বসেই এই খুনের পরিকল্পনা করে। দৈবচক্রে জেকবের সাথে উর্মীর দেখা হয়। আর জেকব জেসিকার কাছে শুনেছিল রশিদ কোরেশির মেয়ের গৃহশিক্ষিকা প্রয়োজন। তার জেকব জেসিকা দিয়ে উর্মীকে সিমিনের গৃহশিক্ষিকা হিসেবে পাঠায়। চুকে গেলো ঘটনা। উর্মী তার রাগ আর ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ করল রশিদ কোরেশিকে খুন করে। অলোকেশ রয়, উর্বী, শুভ্র ও ইন্সপেক্টর মামুন শরিফ এবং এসআই বদ্রিনাথ, আনিকা রশিদের সামনে পুরো ঘটনা উর্মী উচ্ছ্বল চোখে এভাবে বণর্না দিলেন।
বিভি/এআই



মন্তব্য করুন: