নরসিংদীতে শহীদ আসাদের ৫৭তম শাহাদাত বার্ষিকী পালিত
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (শহীদ আসাদ)-কে স্মরণ করেছে নরসিংদীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ৫৭তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে শহীদ আসাদের কবর জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টাব্যাপী কর্মসূচিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রভাতফেরি ও পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানায়। পরে শহীদ আসাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন নরসিংদী জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মনজুর এলাহী, শিবপুর সরকারি শহীদ আসাদ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মতিউর রহমান, শিবপুর শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবুল হারিছ রিকাবদার, আব্দুল মান্নান ভূইয়া পরিষদের সদস্য সচিব আরিফ-উল মৃধা, জেলা যুবদলের সভাপতি মহসিন হোসাইন বিদ্যুৎ, শিবপুর উপজেলা বিএনপি, নরসিংদী জেলা ছাত্রদল, শিবপুর উপজেলা ছাত্রদলসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।
এদিকে, শহীদ আসাদ দিবস উপলক্ষে সকালে শিবপুর শহীদ আসাদ কলেজ মাঠে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কলেজের অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শহীদ আসাদের রাজনৈতিক সতীর্থ তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, প্রফেসর আব্দুল মান্নান খান, তার সহোদর প্রফেসর মনিরুজ্জামান ও আজিজুল্লাহ মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, জেলা যুবদলের সভাপতি মহসিন হোসাইন বিদ্যুৎ, নরসিংদী চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন, কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ, প্রফেসর আবুল বাশার ও প্রফেসর আজিজুর হক মিন্টু প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, শহীদ আসাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তার সাহস ও প্রতিবাদী চেতনা স্বাধীনতার পথে জাতিকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার আদর্শ তুলে ধরতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান তারা।

শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবুল হারিছ রিকাবদার বলেন, ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের হরতাল চলাকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রনেতা আসাদ। আজকের প্রজন্ম এই বীর সেনাকে ভুলতে বসেছে। তার জীবন ও আদর্শ পাঠ্যপুস্তকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার বলেন, ‘জনগণতন্ত্র’ ছিল আসাদের মূলমন্ত্র। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি রাজপথে জীবন উৎসর্গ করেন। তার আত্মত্যাগ স্বৈরশাসনের পতন ত্বরান্বিত করে এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শহীদ আসাদের সহোদর আজিজুল্লাহ মোহাম্মদ নুরুজ্জামান স্মৃতিচারণ করে বলেন, আসাদ শুধু আমার ভাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব ছিল। কোনো অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকতেন না। মানুষের কষ্ট দেখলে পাশে দাঁড়াতেন। ছাত্রজীবনে আসাদ সব সময় বলতেন- জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। সেই লক্ষ্যেই তিনি রাজপথে নেমেছিলেন। পরিবার তাকে হারালেও দেশ পেয়েছে একজন বীর সেনা। তার আত্মত্যাগ কোনো দিন বৃথা যাবে না।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম আসাদকে জানে না, এটা আমাদের ব্যর্থতা। পাঠ্যপুস্তকে তার জীবন ও আদর্শ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এখানে একটি জাদুঘর বা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শহীদ আসাদকে জানতে পারবে। তিনি আরও বলেন, ভাইকে হারানোর শোক আজও আমাকে কাঁদায়, তবে গর্ব হয়- তিনি দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। আমি চাই, তার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তরুণরা গণতন্ত্র ও ন্যায়ের পথে এগিয়ে আসুক।
উল্লেখ্য, শহীদ আসাদ ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদী জেলার শিবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি তৎকালীন স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তিনি।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: