কুয়াকাটার আকাশে রঙিন ফানুস, আলোকিত বৌদ্ধবিহার
সন্ধ্যা নামতেই আলোর ঝলমলে সাজে অন্যরকম রূপ নেয় সাগরপাড়ের পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। বৌদ্ধবিহারের আঙিনাজুড়ে জ্বলে ওঠে প্রদীপ ও মোমবাতি। লাল সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে মোমের আলো, দেয়ালে আঁকা পাহাড়-নদীর ছবিতে আলোর ছটা, আর বিহারের কার্নিশজুড়ে রঙিন বাতির ঝলকানি। এরই মধ্যে রাতের আকাশে উড়তে শুরু করে রঙিন ফানুস। আলোকিত ফানুসের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন উপস্থিত দর্শনার্থীরা। ধর্মীয় আবহ আর উৎসবের আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বৌদ্ধবিহার প্রাঙ্গণ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারে এ আয়োজন করা হয়। তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্যাপন করেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা। সকালে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানো।

উৎসব ঘিরে বিহার প্রাঙ্গণে জড়ো হন শিশু, তরুণ ও প্রবীণসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছেন, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে উপভোগ করেছেন উৎসবের আনন্দ। তরুণদের অনেকেই মুঠোফোনে ধারণ করেন উৎসবের স্মরণীয় মুহূর্ত। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এ আয়োজন স্থানীয় মানুষের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
সন্ধ্যার একপর্যায়ে ‘প্রবারণার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা’ লেখা টি-শার্ট পরা একদল তরুণ বড় আকারের কাগজের ফানুস নিয়ে আসেন। ফানুসের ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে গরম বাতাসের সাহায্যে সেটি ওড়ানোর প্রস্তুতি নেন তাঁরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফানুসটি উড়ে যায় রাতের আকাশে। ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে থাকা আলোকিত ফানুসটির দিকে তাকিয়ে থাকেন উপস্থিত সবাই। কেউ মুঠোফোনে ধারণ করেন সেই দৃশ্য, কেউ উপভোগ করেন নীরবে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে ফানুস ওড়ানো মঙ্গলকামনা, শান্তি ও আশার প্রতীক।

কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারে আশ্রয়ে রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা ২৪ জন অনাথ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ২০ জন শিশু এবং দুজন কলেজে পড়াশোনা করছে। বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো বলেন, দরিদ্র ছাত্র উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের বিনা খরচে থাকা ও পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাদের শিক্ষা-সংক্রান্ত ব্যয়ও ফাউন্ডেশনের তহবিল থেকে বহন করা হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মৈত্রীর বার্তা বহন করে। তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে এ উৎসব উদ্যাপন করা হয়। এদিন নিজের ভুলত্রুটি উপলব্ধি ও সংশোধন, অন্যের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া এবং সব প্রাণীর মঙ্গল কামনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কুয়াকাটার মিশ্রিপাড়া সীমা বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ উত্তম ভিক্ষু, যিনি উত্তম স্থবির নামেও পরিচিত, বলেন, নিজের দোষ স্বীকার করা, অন্যের প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া এবং সব প্রাণীর মঙ্গল কামনাই প্রবারণা পূর্ণিমার মূল শিক্ষা।
তিনি আরও বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারে সকালে অষ্টশীল গ্রহণ, বুদ্ধবন্দনা ও সূত্রপাঠের আয়োজন করা হয়। দিনভর চলে বুদ্ধপূজা, সংঘদান ও পিণ্ডদান। সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণীয় আয়োজন সম্পন্ন হয়।
বিভি/টিটি













মন্তব্য করুন: