অপবাদ ও মারধরের অভিযোগে যুবকের আত্মহত্যা, ২ লাখ টাকায় মীমাংসার চেষ্টা
মানিকগঞ্জের ঘিওরে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে গোসলখানায় উঁকি দেওয়ার অপবাদ ও মারধরের অভিযোগ ওঠার পর সানোয়ার হোসেন (৩০) নামে এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। অপমান ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি নিহতের স্বজন ও স্থানীয়দের। এ ঘটনায় এক নারীকে আটক করে থানায় নেওয়ার পর রাতের আঁধারে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এমনকি দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি মীমাংসার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে ঘিওর সদর ইউনিয়নের পূর্বপাড়া এলাকায় নানির বাড়ির একটি টিনশেড ঘরের কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত সানোয়ার ওই এলাকার শামসুল হকের ছেলে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছোটবেলায় মায়ের মৃত্যুর পর নানি কুলসুম বেগমের কাছে বড় হন সানোয়ার। তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। সংসারে আট বছর বয়সী ছেলে সামিউল ইসলাম সিয়াম ও দেড় বছর বয়সী মেয়ে সিনহা রয়েছে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী পিয়াস আহমেদ মুমিনের স্ত্রী রিমি আক্তার সানোয়ারের বিরুদ্ধে তাদের গোসলখানায় উঁকি দিয়ে গোসল দেখার অভিযোগ করেন। এ অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই মুমিন সানোয়ারের বাড়িতে গিয়ে তাকে গালাগাল ও মারধর করেন। পরে আবার মারধরের পাশাপাশি হত্যার হুমকিও দেন।
স্বজনদের ভাষ্য, এ ঘটনার পর সানোয়ার পাশের বাড়ির ঘিওর সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. নূরুল ইসলামের কাছে বিচার চাইতে যান। তাকে বাড়িতে না পেয়ে ফিরে আসার পথে মুমিনের সঙ্গে দেখা হলে তিনি আবারও সানোয়ারকে মারধর করেন এবং রাতে কুপিয়ে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, অপবাদ, মারধর, হত্যার হুমকি এবং সামাজিকভাবে অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সানোয়ার। একপর্যায়ে সোমবার সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে বাড়ির পাশেই নানি কুলসুম বেগমের টিনশেড ঘরের একটি কক্ষে সিলিংয়ের সাথে গলায় ফাঁস দেন তিনি।
এদিকে নিহতের স্ত্রী রুমা আক্তার জানান, ঘটনার দিনই তিনি সাভারের একটি গ্যাস লাইট কোম্পানিতে চাকরিতে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী একজন ভালো মানুষ ছিলেন। আমাদের বাড়ি থেকে অভিযুক্তদের বাড়ির মাঝখানে আরও দুটি ফাঁকা ভিটা রয়েছে। এত দূর থেকে গোসলখানার ভেতরে কিছু দেখা সম্ভব নয়। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার স্বামীকে মারধর ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমার দুটি ছোট সন্তান এখন বাবাহারা। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
নিহতের বৃদ্ধ নানি, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরাও একই অভিযোগ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
ঘটনার খবর পেয়ে ঘিওর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) চিন্ময় মণ্ডল সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তিনি মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে সানোয়ারের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় নিহতের পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী অভিযুক্ত রিমি আক্তার ও পিয়াস আহমেদ মুমিনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
অন্যদিকে, পুলিশ রিমি আক্তারকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর কথিত এক নেতার সুপারিশে রাতের আঁধারে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনেরা। দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি মীমাংসার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা কোনো আপস-মীমাংসা চান না। প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে মামলা করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে শাস্তির দাবি করেন।
বিভি/এসজি













মন্তব্য করুন: