অ্যাপসে জামানতবিহীন ঋণের প্রলোভনে চক্রটি হাতিয়ে নিতো গ্রাহকের তথ্য
অ্যাপসভিত্তিক ডিজিটাল মাইক্রোফাইন্যান্সের নামে অবৈধ সুদের ব্যবসা পরিচালনাকারী একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। চক্রটি অ্যাপসের মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের মোবাইল থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিতো।
বৃহস্পতিবার (৭ অক্টোবর) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান ডিবি প্রধান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার।
তিনি জানান, গত ৫ ও ৬ অক্টোবর অব্যাহত অভিযানে রাজধানীর ধানমন্ডি, বনানী এবং মিরপুর এলাকা থেকে ইমানুয়্যাল এডওয়ার্ড গোমেজ, আরিফুজ্জামান, শাহিনূর আলম ওরফে রাজীব, শুভ গোমেজ ও মো. আকরামসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। এসময় তাদের কাছ থেকে ১টি ছাই রংয়ের এলিয়ন গাড়ি, ৯টি মোবাইল ফোন, ৯টি সিম কার্ড, ৪টি ল্যাপটপ ও ৪টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই জব্দ করা হয়।
গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম-এর তত্ত্ববধানে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ফজলুর রহমান-এর সার্বিক তদারকিতে ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আশরাফ উল্লাহ-এর নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয়।
ডিবি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, গ্রেফতারকৃতরা সরকারি অনুমোদন ব্যতীত- থান্ডার লাইট টেকনোলজি লিমিটেড, নিউ ভিশন ফিনটেক লিমিটেড ও বেসিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতো। আইনগত অনুমোদন ব্যতীত তারা গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করছিলো। গ্রাহকরা তাদের অ্যাপস ইন্সটল করার মাধ্যমে অ্যাপসে গ্রাহকের অজান্তে ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট পড়া, গ্রাহকের অনুমতি ব্যতিত দূর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গ্রাহকের মোবাইল ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও ধারণ, মোবাইলের কন্টাক্টস পড়াসহ মোবাইলের এক্সাক্ট লাইভ লোকেশন নির্ণয়, ফোনের স্ট্যাটাস এবং তথ্য সংগ্রহ, ফোনে সংরক্ষিত মেসেজ পড়া, পরিবর্তন করার অনুমতি নিয়ে নিতো তারা। এতে গ্রাহকের পারসোনাল ডাটা সিকিউরিটির চরম হুমকিতে পরে।
তিনি আরও বলেন, গ্রেফতারকৃতরা অনলাইন অ্যাপস যেমন; Tkala – Personal Loans Online (Tkala. Thala-0430 ), Cashman (Cashman-0514, Cashman-0326), RapidCash- Quick Online eLoans App, AmarCash-Personal Loans Online, Cashkash-Fast Loans Online, ও CashCash এর মাধ্যমে জামানতবিহীন লোন দেওয়ার নামে মাত্রাতিরিক্ত সুদের কারবার পরিচালনা করতো। এসব অ্যাপসগুলোর সার্ভার চায়নাতে অবস্থিত এবং এগুলো মূলত চায়না থেকে পরিচালিত হয়। কিছু চাইনিজ নাগরিক বাংলাদেশি নাগরিকের সহায়তায় এই অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে জামানতবিহীন স্বল্প সুদে লোন প্রদান করার নামে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহক আকৃষ্ট করে। তাদের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে গ্রাহকরা লোন গ্রহণ করার পর স্বল্প সুদের পরিবর্তে উচ্চহারে সুদ প্রদানের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতারণার শিকার এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ধানমন্ডি থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা রুজু হয়। এ মামলার তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। জানা যায়, গ্রেফতারকৃত প্রতারকরা ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের নামে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে। তারা মূলত অর্থ সংকটে থাকা স্বল্প আয়ের লোকজন এবং বেকার ছাত্র-ছাত্রীদের টার্গেট করে। টার্গেটকৃত গ্রাহকরা বিজ্ঞাপনে প্রদর্শিত লিংকে ক্লিক করে কিংবা গুগল স্টোর থেকে অ্যাপসগুলো ডাউনলোড করে, অ্যাপসের অনুমতি চাওয়া বিষয়ে পারমিশন দিলে অ্যাপসটি গ্রাহকের মোবাইলে ইন্সটল হয়ে যায়। এরপর গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, ফোন নাম্বার, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ফোন নাম্বার ও তাদের ব্যক্তিগত তথ্যসহ অন্যান্য তথ্য দিয়ে একাউন্ট খোলা হয়। চাহিদা অনুযায়ী আবেদনের প্রেক্ষিতে মাত্রাতিরিক্ত প্রসেসিং ফি নিয়ে এবং উচ্চহারে সুদ নির্ধারণ করে ৩ থেকে ৭ দিনের জন্য ঋণ প্রদান করে। গ্রাহক ৩০০০ টাকার জন্য আবেদন করলে অনুমোদনের পর প্রসেসিং ফি বাবদ ৮১০ টাকা রেখে গ্রাহককে মাত্র ২১৯০ টাকা প্রদান করা হয়। ৭ দিন শেষে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয় মোট ৩,০১৮ টাকা। মেয়াদ শেষে অনাদায়ে প্রতিদিন হিসাবে গ্রাহককে উচ্চহারে সুদ প্রদান করতে হয়। এছাড়াও অ্যাপ্লিকেশন ফি বাবদ ১২০ টাকা, ডাটা অ্যানালাইসিস ফি ১৮০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ১৫ টাকা এবং সুদ বাবদ ৫ টাকা কেটে রাখার যুক্তি দেখায়। তবে, পরিমাণ যতো বেশি হবে টাকাও ততো বেশি কেটে রাখা হয়। এ ঋণের টাকা গ্রাহককে বিকাশ অথবা নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। প্রতারকদের এ লোভনীয় অফারের ফাঁদে পরে অনেকে সর্বস্ব হারায়।
সাধারণ গ্রাহকের উদ্দেশ্যে তিনি বলের, যে কোনো অ্যাপস ইন্সটল করার পর অথবা কোন লিংকে প্রবেশ করার পর ব্যক্তিগত কোনো তথ্য দেওয়ার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি ভালোভাবে নিশ্চিত হতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য যত্রতত্র শেয়ার না করার অনুরোধও জানান পুলিশের এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
বিভি/এসএইচ
বিভি/এসএইচ/এসডি













মন্তব্য করুন: