• NEWS PORTAL

  • বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

৩ মাস ধরে বেতন নেই, আশ্বাসেই চলছে বুটেক্সের ৪৯ কর্মীর কাজ 

রাতুল সাহা, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় 

প্রকাশিত: ১০:০৩, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
৩ মাস ধরে বেতন নেই, আশ্বাসেই চলছে বুটেক্সের ৪৯ কর্মীর কাজ 

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৪৯ জন কর্মী তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া ও সরকারি নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বেতন পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বেতন না পেয়ে ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন অনেক কর্মী। আসন্ন পূজার আগে বকেয়া বেতন পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, সামাইরা জবস ব্রিজ লিমিটেড ও আল মোমেন আউটসোর্সিং লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে এসব কর্মী কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে নিরাপত্তারক্ষী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন। আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আশ্বাসে তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছেন বলে তারা দাবি করে। তবে বেতন পরিশোধের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত পাননি কর্মীরা।

সামাইরা জবস ব্রিজ লিমিটেডের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটি পৃথক চুক্তির অধীনে মোট ১৪ জন কর্মী কাজ করছিলেন। এর মধ্যে একটি চুক্তির মেয়াদ গতবছর জুনে শেষ হয় যার অধীনে পাঁচ জন কর্মী ছিলো। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরের বেতন নিজস্ব অর্থায়নে পরিশোধ করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানান। এসময় বিশ্ববিদ্যালয় সেই বিল এখনো পরিশোধ করেনি। বাকি নয় জন কর্মীর ক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হয়।

অন্যদিকে সামাইরা জবস ব্রিজ লিমিটেডের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তির অধীনে মোট ৩৫ জন কর্মী কাজ করছিলেন যেটার মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হয়। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা নীতিমালা, ২০২৫ এর সংশোধিত অনুচ্ছেদ ৫ এর (খ) (২) অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক সেবা ক্রয়কারী মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তরসমূহ সরাসরি ব্যক্তির সেবা ক্রয় করতে পারবে। এছাড়াও অর্থ বিভাগ কর্তৃক অনুমোদিত কোন বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান হতেও সেবা ক্রয় করা যাবে। এছাড়া নতুন সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা ক্রয় করা যাবে না। তবে ইতোমধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পাদিত চুক্তির অধীনে ক্রয়কৃত সেবার মেয়াদ চুক্তির মেয়াদকাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

বেতন বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন কর্মীরা। জিএমএজি ওসমানী হলের গেটে দায়িত্ব পালনকারী কর্মচারী মো. শফিউল বাশার বলেন, তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না, এখন চতুর্থ মাস চলছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, ইউজিসির চিঠি এলেই বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু এভাবে আর কত দিন চলব, বুঝতে পারছি না। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বাসায়ও সবকিছু খুলে বলতে পারি না। কীভাবে চলছি, সেই কষ্ট কাউকে বোঝানোও কঠিন। সব মিলিয়ে খুব সমস্যার মধ্যে পড়ে গেছি।

একই দায়িত্বে থাকা কর্মী শুভাস সরকার বলেন, টাকার অভাবে পরিবার নিয়ে বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও অনুষ্ঠানেও থাকতে পারিনি। সামনে আবার পূজার ছুটি, কিন্তু বাড়ি যাব কীভাবে, সেই চিন্তায় আছি। পরিবারকে কীভাবে বোঝাব যে বেতন না পাওয়ায় বাড়ি যেতে পারছি না? সব মিলিয়ে খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে আমাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তারক্ষী বলেন, ১৫ দিন আগেও আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু এখনো বেতন পাইনি। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো চুক্তি নবায়নের বিষয়ে বারবার আকবর স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি বলে আমাদের মনে হয়েছে। বিভিন্ন অজুহাতে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি ঝুলে ছিলো।

ওই নিরাপত্তারক্ষী আরও বলেন, ইউনূস সরকারের সময় বৈশাখী ভাতাসহ আরও কিছু ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও আমরা সেগুলো পাইনি। আমরা কাজ করছি, অথচ তিন-চার মাস ধরে বেতন পাচ্ছি না। এখন সরকারি নিয়মের কথা বলে আমাদের বেতন আটকে রাখা হচ্ছে। তাহলে ভাতার ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি কেন?

চুক্তি নবায়ন না করার বিষয়ে সামাইরা জবস ব্রিজ লিমিটেডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্তের কথা প্রতিষ্ঠানটিকে আগেই জানানো হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তাঁদের জানিয়েছিলেন, আগের পদ্ধতিতে চুক্তি নবায়ন না করে সরাসরি দরপত্রের মাধ্যমে সেবা নেওয়া হতে পারে। একারণে পরবর্তী চুক্তি নবায়নের জন্য তাঁরা আর আবেদন করেননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অ্যান্ড সিকিউরিটি অফিসের স্টেট অফিসার মো. বাবুল আক্তার বলেন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৪৯ জন কর্মীর বেতন গত তিন থেকে চার মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দুই বছর মেয়াদি চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া ২৫ জন নিরাপত্তারক্ষীর চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের জুনে শেষ হয়েছে। সরকারি নীতিগত পরিবর্তনের কারণে আগের আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে বেতন পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এখনো সমাধান হয়নি। কর্মীদের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, কর্মীদের বেতন পরিশোধে সরকারি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোনো তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পূজার ছুটির আগে বা ছুটির মধ্যে অন্তত একটি বিল পরিশোধের চেষ্টা চলছে, যাতে কর্মীরা পূজা ভালোভাবে কাটাতে পারেন। তবে পরবর্তী বিলগুলো কবে পরিশোধ করা যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিদ্ধান্ত জানাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ মো. মামুন কবির বলেন, বর্তমানে কর্মরত কর্মীদের বেতন তৃতীয় পক্ষের পরিবর্তে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে কর্মীদের বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে সাময়িকভাবে অর্থ দিয়ে কর্মীদের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব কি না, জানতে চাইলে অধ্যাপক শেখ মো. মামুন কবির বলেন, নির্দিষ্ট খাতের অর্থ অন্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ নেই। এতে নিরীক্ষার সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

বিভি/এসজি

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত