পপসম্রাট আজম খানের জন্মদিন আজ
ছবি: আজম খান (সংগৃহীত)
বিনোদন জগতের সংগীতাঙ্গনের জনপ্রিয় পপসম্রাট কিংবদন্তি প্রয়াত আজম খানের আজ জন্মদিন। ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে তিনি পপ গানকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে দিয়েছেন নতুন ধারার ব্যান্ডসংগীত।
বাংলার সম্রাট স্বপ্ন দেখিয়েছেন দেশের তরুণদের। পপ গানকে লালন করেছেন, শ্রোতা তৈরি করেছেন। পপ গানের ধারা যেন সময়ের সঙ্গে প্রবহমান থাকে, সেই পথও তৈরি করে দিয়ে গেছেন আজম খান। প্রয়াত এ কিংবদন্তি গুণী শিল্পী ২০১১ সালের ৫ জুন মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে মৃত্যুর কাছে হার মানেন। তিনি দেশবাসীকে কাঁদিয়ে পরপারে চলে যান। সশরীর না থাকলেও তার গান আজও সমসাময়িক। এই গানগুলোই তাকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখবে।
স্কুলে পড়াকালে আজম খান বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানি শাসকরা নানাভাবে দেশের মানুষকে ঠকাচ্ছে। সেই চেতনা থেকে তার মধ্যে ভর করে বিপ্লবী চিন্তা। তখনই জানতে পারেন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর কথা, যারা গণসংগীতের চর্চা করত। বন্ধুদের নিয়ে সেখানে গান করতে থাকেন আজম খান। গান নিয়ে ঢাকার বাইরে যাওয়া শুরু করেন তারা। তাদের গানে উঠে আসে সাধারণ মানুষের কথা। প্রতিবাদী গানের জন্য পুলিশের লাঠির বাড়িও খেয়েছেন তিনি। গণ–আন্দোলনের সময়গুলোতেও গান করে গেছেন এ গায়ক।
তার শৈশব কেটেছে আজিমপুর ও কমলাপুরে। একটু বড় হতেই পেয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনের আঁচ। তার গানে আসার ক্ষেত্রে ওই সময়ের প্রভাব আছে। জানালার বাইরে তিনি দেখতেন মাতৃভাষার জন্য মানুষের গণজমায়েত। জানালার বাইরে শুনতেন ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, ‘কইমু না ভাই কইমু না অন্য কথা কইমু না’ গানগুলো। স্কুলে পড়ার সময় পিটিতে সবার সঙ্গে গান গাইতেন। এসব গান মনে রাখতে পারতেন আজম খান। যে গান ভালো লাগত সেটাই শুনতেন, পরে হুবহু সেটা গাওয়ার চেষ্টা করতেন।
জীবদ্দশায় গণমাধ্যমের এক সাক্ষাৎকারে আজম খান বলেছিলেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান, আবদুল আলিম, শ্যামলের গান তাদের মতো করেই গাইতাম। পরে মহল্লার বন্ধু-সমবয়সীদের সঙ্গে আড্ডায় বানিয়ে গান গাইতাম। এভাবেই একদিন গানের দিকে ঝুঁকে পড়ি। গানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমার ছিলো না।
আজম খান আরও বলেন— আমি গান শুনে হুবহু গাইতে পারতাম। অনেকের কাছে এটা বিস্ময়কর ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে তিনি বলেছিলেন—দেখতে দেখতে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। পাকিস্তানি আর্মিদের গাড়ি দেখে দেয়াল টপকে একবার আজিমপুর আবার কমলাপুর— এভাবে চলছিলো। দেশের মানুষকে নির্বিচারে হত্যা শুরু করেন পাকিস্তানিরা। তখন মনে হলো মরছিই যখন, মেরেই মরবো।
বন্ধুদের সঙ্গে পরিকল্পনা করে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আজম খান। যেভাবেই হোক, দেশ স্বাধীন করতে হবে। একদিন সকালে মাকে বললেন, ‘আমি যুদ্ধে যেতে চাই।’ মা কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, ‘তোর বাবাকে বল।’
তার বাবা ছিলেন কিছুটা রাশভারি মানুষ। কথা কম বলতেন। আজম খান ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ান। বাবাকে জানান যুদ্ধে যাওয়ার কথা। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আজম খানের পা, বুক কাঁপছিলো। কাঁপা কাঁপা বুকে একদৃষ্টে মাটির দিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। মনে মনে সেদিন ভেবেছিলেন, বাবা হয়তো থাপ্পড় মারবেন নয়তো লাথি মারবেন। কিছু সময় চুপ করে থাকার পর তার বাবা বলেছিলেন— ‘যুদ্ধে যাবি যা, কিন্তু দেশ স্বাধীন করেই তবে ঘরে ফিরবি।’
আব্বাকে সালাম করে সকাল সাড়ে ১০টায় দুই বন্ধুকে নিয়ে ভারতে ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন আজম খান। দেশ স্বাধীন করার জন্য ছুটেছিলেন তারা। ট্রেনিং নিয়ে শুরু করেছিলেন যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পেও চলত তার গানের চর্চা। নতুন নতুন গান বাঁধতেন সেখানে। থালাবাসন ছিলো বাদ্যযন্ত্র। তখন আজম খানের গান শোনার জন্য ভিড় জমাতেন মুক্তিযোদ্ধারা। সবার কাছে আজম খান পরিচিতি পেলেন গায়ক হিসেবে। পরে দেশ স্বাধীন করেই ফিরেছিলেন আজম খান।
তারপর শুরু হলো সংগীতচর্চা। শুনতেন বিটলস, দ্য শ্যাডোজ, রোলিং স্টোনের গানগুলো। একসময় বন্ধুদের নিয়ে গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করেন। সেই অনুষ্ঠানগুলোতে পপ গান গাইতেন তারা। আজম খানের গানের ভক্ত জুটে যায় পাড়া-মহল্লায়। তারপর সারা দেশে।
বঞ্চিত মানুষের গান করতে শুরু করেন আজম খান। তার গানে আসতে থাকে সচেতনতা, দেশপ্রেম, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় এবং তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণ। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চলতে থাকে তার গান। সে সময় তিনি গেয়েছিলেন— ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘এ সুন্দর দুনিয়ায়’, ‘অভিমানী’, ‘অনামিকা’, ‘পাপড়ি’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘আসি আসি বলে তুমি আর এলে না’, ‘আমি যারে চাইরে’, ‘জ্বালা জ্বালা’, ‘ও চাঁদ সুন্দর’, ‘ও রে সালেকা ও রে মালেকা’, ‘জীবনে কিছু পাব না রে’, ‘বাধা দিয়ো না’সহ অনেক জনপ্রিয় গান।
বিভি/এআই



মন্তব্য করুন: