ফ্রান্সের পৌরসভা নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সরব অংশগ্রহণ
ফ্রান্সের আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রবাসী কমিউনিটিতে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। চলতি মাসের ১৫ মার্চ প্রথম দফা এবং ২২ মার্চ দ্বিতীয় দফা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন শহরে অর্ধ-ডজনের বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় কাউন্সিলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিরা যুক্ত হলে শিক্ষা, বাসস্থান, কর্মসংস্থান এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমসহ কমিউনিটির নানা বাস্তব সমস্যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
প্যারিসের উপকণ্ঠে ইফিনি-সুর-সেইন এলাকায় কমিউনিটির পরিচিত মুখ ও ব্যবসায়ী রাব্বানী খান পুনরায় কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক হিসেবে জয়লাভ করেছিলেন। ফরাসি ভাষা শিক্ষা এবং প্রশাসনিক সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তিনি সুপরিচিত। এবারও তিনি বর্তমান মেয়র আজাদিন তাইবি-র নেতৃত্বাধীন প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
ইল-দু-ফ্রঁস অঞ্চলের ভিন্যু-সুর-সেইন এলাকায় সমাজকর্মী এনকে নয়ন কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বামপন্থী দল সমর্থিত ‘ভিন্যু সলিদেয়ার এ পপুলেয়ার’ প্যানেলের প্রার্থী। একই সঙ্গে তিনি ডেপুটি মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবেও রয়েছেন। নিজ প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন কমিউনিটি সেবা দিয়ে তিনি স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন।
একই এলাকা থেকে আব্দুস সামাদ ‘লা ফ্রঁস আনসুমি’ সমর্থিত প্যানেলে কাউন্সিলর পদে লড়ছেন। নির্বাচিত হলে তিনি কমিউনিটির কল্যাণ এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেবেন।
লা-কোরনুভ এলাকায় উদ্যোক্তা আকাশ বড়ুয়া ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত প্যানেল থেকে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। তার মতে, মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিরা ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারেন।
একই এলাকায় ব্যাংকার নাসির উদ্দীন ভুঁইয়া মেয়র পদপ্রার্থী ওমারো দোকুরু-র প্যানেল থেকে কাউন্সিলর হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই তার প্রধান লক্ষ্য।
এদিকে ফ্রান্স জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় জুবাইদ আহমেদ ইভিরি-সুর-সেইন এলাকায় ফিলিপ বয়ুসুর নেতৃত্বাধীন প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গন থেকে স্থানীয় রাজনীতিতে তার অংশগ্রহণ তরুণ ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, সরুফ সোদিওল সেন্ট-দেনি এলাকায় বর্তমান মেয়র ম্যাতিউ হানোতিন-এর প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী ছিলেন।
ফ্রান্সের পৌরসভা নির্বাচনের কাঠামো কিছুটা ভিন্ন। এখানে ভোটাররা সরাসরি মেয়র নির্বাচন করেন না। নাগরিকরা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকার পক্ষে ভোট দেন, যা সাধারণত মেয়র প্রার্থীর নেতৃত্বে গঠিত হয়। তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রার্থীদের মধ্যে থেকেই ভোটের অনুপাত অনুযায়ী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
প্রথম দফায় কোনো তালিকা ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেলে তারা কাউন্সিলের অর্ধেক আসন ‘মেজরিটি বোনাস’ হিসেবে পায়। বাকি আসনগুলো আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়। কোনো তালিকা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে দ্বিতীয় দফা ভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে সর্বাধিক ভোট পাওয়া তালিকা বোনাস আসন পায়।
প্রশাসনিকভাবে ফ্রান্স ১৮টি অঞ্চল, ১০১টি বিভাগ এবং প্রায় ৩৫ হাজার কমিউনিসিটি নিয়ে গঠিত। রাজধানী প্যারিসসহ সারা দেশে একই নিয়মে মিউনিসিপাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের এই অংশগ্রহণ প্রবাসী কমিউনিটির রাজনৈতিক পরিপক্বতার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় প্রশাসনে সক্রিয় উপস্থিতি ভবিষ্যতে ফ্রান্সের রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান ও শক্তিশালী করবে।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: