• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

এআই শিল্পের দ্রুত বিকাশ, তবুও পিছিয়ে পড়ছেন নারীরা; নেপথ্যে কী?

প্রকাশিত: ২৩:৪৬, ৪ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
এআই শিল্পের দ্রুত বিকাশ, তবুও পিছিয়ে পড়ছেন নারীরা; নেপথ্যে কী?

ছবি: গার্ডিয়ান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাত বদলে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে উচ্চ বেতনের অসংখ্য নতুন চাকরি। কিন্তু এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেই নারীদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কম। ফলে প্রযুক্তি যখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, তখন এআইয়ের ব্যবহার ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা কেন পিছিয়ে পড়ছেন; এমন প্রশ্নই সামনে আসছে।

সিলিকন ভ্যালিতে প্রচলিত একটি আশঙ্কা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দ্রুত বাড়তে থাকা উচ্চ বেতনের চাকরিগুলোতে জায়গা করে নিতে না পারলে অনেক মানুষ ‘স্থায়ী নিম্নবর্গে’ পরিণত হতে পারেন। অর্থাৎ তাদের পেশাগত ও আর্থিক উন্নতির সুযোগ ক্রমেই কমে যাবে। এতদিন এটি ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা হিসেবে দেখা হলেও প্রযুক্তি খাতে কর্মরত নারীদের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতা যেন ইতোমধ্যেই দেখা দিতে শুরু করেছে।

এআইভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রাইওরিওয়াইজের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী উর্বশী বাত্রা বলেন, অনেকে মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নারীদের জন্য বাধা কমিয়ে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমান করে দিচ্ছে। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাত্রার দাবি, একটি এআই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে তার পুরুষ সহপ্রতিষ্ঠাতার তুলনায় তাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। এমনকি বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তারা দেখেছেন, পুরুষ সহপ্রতিষ্ঠাতা কথা বললে বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

লিংকডইনের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, গত এক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত পদে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মাত্র প্রায় এক-চতুর্থাংশ নারী। অথচ এআইয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়; এমন পদে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের অর্ধেকই নারী।

নির্বাহী পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ আরও কম। সেখানে এআইসংক্রান্ত পদে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মাত্র ১৩ শতাংশ নারী। অন্যদিকে, এআইয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা গ্রাহকসেবা ও অনুরূপ কাজগুলোতে নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও তাদের বেশি বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

২০২৩ সালের তুলনায় এআইসংক্রান্ত চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দ্বিগুণ হয়েছে। এসব চাকরিতে অন্যান্য পদের তুলনায় গড়ে দ্বিগুণেরও বেশি বেতন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এআই খাতে চাকরি পাওয়া নারীদের বড় অংশই তুলনামূলক কম বেতনের পদে কাজ করছেন। এর মধ্যে তথ্য যাচাই ও শ্রেণিবিন্যাসের মতো কাজও রয়েছে।

লিংকডইনের বৈশ্বিক জননীতি অংশীদারত্ব বিভাগের প্রধান সারাহ স্টেইনবার্গ বলেন, এআই-সংক্রান্ত সব পেশা বিবেচনায় পুরুষদের মধ্যম বেতন নারীদের তুলনায় প্রায় ৪৫ হাজার ডলার বেশি। তার ভাষায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা, সবচেয়ে বেশি বেতনের এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চাকরি তৈরি করছে। কিন্তু এসব চাকরিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত কম।

নারীদের প্রযুক্তি খাতে এগিয়ে নিতে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আনিতা বি অর্গের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডা ডারডেন উইলকারসন মনে করেন, এ পরিস্থিতি প্রযুক্তি খাতে নারীদের অগ্রগতিকে উল্টো দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন আবার পিছিয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের মোট চাকরির প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নারী রয়েছেন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি হারে প্রযুক্তি খাত ছেড়ে দেন। এর পেছনে বৈষম্যমূলক কর্মপরিবেশ, অন্তর্ভুক্তির অভাব এবং পদোন্নতিতে বাধার মতো বিষয়কে দায়ী করা হয়।

এআই খাতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান টিউরিংয়ের এআই প্রকৌশল বিভাগের প্রধান জায়েতা পুতাতুন্দা। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ অত্যন্ত দ্রুত। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চাপও অনেক বেশি। কর্মজীবনে তিনি এমন অনেক মেধাবী নারীকে দেখেছেন, যারা কোনো না কোনো পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়েছেন।

তার মতে, অনেক সময় একটি দলে একমাত্র নারী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতে হয়। নারীর সংখ্যা কম থাকলে নিজেদের মতামত ও ধারণাকে গুরুত্ব দিতে অন্যদের তুলনায় আরও জোরালোভাবে কথা বলতে হয়। এআই খাতে অভিজ্ঞ নারী সহকর্মীদের কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়াও কঠিন। এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার চাপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে অনেককে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়।

পুতাতুন্দার নিজের অভিজ্ঞতাও এই সমস্যার দিকটি স্পষ্ট করে। তিনি চার মাস মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার পর কাজে ফিরে দেখেন, এরই মধ্যে এআই খাতে নতুন নতুন কাঠামো ও মডেল চলে এসেছে। ফলে আবার সবকিছুর সঙ্গে তাল মেলানো তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

সহকর্মীদের সহযোগিতা এবং সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব স্বামীর সঙ্গে সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন। পুতাতুন্দার মতে, নারীরা এআই খাত থেকে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ তাদের আগ্রহ বা সক্ষমতার অভাব নয়। বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল এই খাতে টিকে থাকার জন্য যে সহায়ক ব্যবস্থা প্রয়োজন, অনেক নারীর সেটি থাকে না।

এআই শিল্প একেবারেই নতুন হওয়ায় তাত্ত্বিকভাবে এখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকার কথা। কারণ মাত্র এক বছর আগে তৈরি কোনো প্রযুক্তি বা মডেলের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে কারও দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, পরিচিতজনের সুপারিশ এবং পুরোনো নিয়োগপ্রক্রিয়াই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উইলকারসন বলেন, কোম্পানিগুলো দ্রুতগতিতে কর্মী নিয়োগ করলেও তারা একই নেটওয়ার্ক, একই সুপারিশ এবং একই ধরনের বাছাই পদ্ধতির মাধ্যমে কর্মী খুঁজছে। এতে নারীরা প্রয়োজনীয় সুযোগ ও পরিচিতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শদান, প্রশিক্ষণ ও বৈচিত্র্য বাড়ানোর বিভিন্ন কর্মসূচি চালু ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক প্রতিষ্ঠান এসব কর্মসূচি কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার কর্মসূচিগুলো নানা রাজনৈতিক ও আইনি চাপের মুখে পড়েছে। ফলে নারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে সহায়তা করার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও কমেছে।

এআই খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করা সংগঠন ‘এআই পাওয়ার্ড উইমেন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ফেলিসিয়া নিউহাউস বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে কোম্পানিগুলোকে নারীকেন্দ্রিক উদ্যোগে রাজি করানো আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ায় কোম্পানিগুলোও এসব উদ্যোগ থেকে সরে আসছে। অ্যাকসেঞ্চার, ডেলয়েট, আইবিএম ও পেপ্যালের মতো বড় প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের মামলায় কোটি কোটি ডলারের সমঝোতায় যেতে হয়েছে।

এআই খাতে নারীরা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিউহাউস। তার মতে, প্রশ্নটি শুধু চাকরি পাওয়া বা না পাওয়ার নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেহেতু বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে, তাই এই প্রযুক্তি তৈরিতে নারীদের অংশগ্রহণ কমে গেলে অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রেও বড় বৈষম্য তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আলোচনা করছি; অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি বড় নতুন উৎস থেকে কে সুবিধা পাবে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, অংশগ্রহণের ব্যবধান শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ব্যবধানে পরিণত হতে পারে।’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরক বিকাশ যেমন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি সেই সুযোগের দরজা নারীদের জন্য কতটা খোলা থাকছে—এখন সেটিই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।

সূত্র: গার্ডিয়ান

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন: