• NEWS PORTAL

  • মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

চীনের এআই খাতে মহাধস, চার মাসেই ৪০ শতাংশ শেয়ারের পতন

প্রকাশিত: ১১:৩৯, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
চীনের এআই খাতে মহাধস, চার মাসেই ৪০ শতাংশ শেয়ারের পতন

ছবি: রয়টার্স

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন বিনিয়োগের উন্মাদনা, তখন চীনের শেয়ারবাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। অতিরিক্ত মূল্যায়ন, এআইয়ের চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ এবং চীনা প্রযুক্তিপণ্য রফতানিতে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় গত চার মাসেরও কম সময়ে দেশটির এ খাতের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এতে বাজারমূল্য থেকে উধাও হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি ডলার।

এই ধস শুধু প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, চীনের সামগ্রিক শেয়ারবাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ছেদ পড়েছে। একই সঙ্গে এআই খাতের সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য সাধারণ মানুষকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার সরকারের উদ্যোগও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অতিমূল্যায়িত শেয়ারের দরপতন আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

চীনের শেয়ারবাজারে প্রায় দুই বছর ধরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা চলছিল। অর্থনৈতিক প্রণোদনার প্রতিশ্রুতিতে শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করে। দীর্ঘদিনের উত্থান-পতনের চক্র ভেঙে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির বাজার গড়ে তোলাই ছিল বেইজিংয়ের লক্ষ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক ধস সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

চীনের প্রধান ব্লু-চিপ সূচক সিএসআই ৩০০ গত জুনে পৌঁছানো সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তি ও এআই খাতের গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত স্টার ৫০ সূচক চার মাসেরও কম সময়ে প্রায় ৪০ শতাংশ হারিয়েছে।

বেইজিংভিত্তিক তহবিল ব্যবস্থাপক দং বাওঝেন বলেন, শেয়ারবাজার একপর্যায়ে জল্পনা-কল্পনানির্ভর উন্মত্ত ঊর্ধ্বমুখী বাজারে পরিণত হয়েছিল। এখন সেই বুদ্‌বুদ ফেটে যেতে দেখা যাচ্ছে।

চীনের বাজারে এ পতন পশ্চিমা দেশ ও এশিয়ার অন্যান্য বাজারের তুলনায় বেশি তীব্র। যুক্তরাষ্ট্রের এআই কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও চাপ তৈরি হয়েছে। তবে তিন সপ্তাহ আগে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠা নাসডাক সূচক সেখান থেকে প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে, যা চীনের বাজারের তুলনায় অনেক কম।

চীনের বাজারে পতনের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনা স্পষ্ট নয়। তবে শেয়ারের অতিরিক্ত দাম, কর পরিশোধের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের ডেটা সেন্টারে চীনা প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে।

গোল্ডম্যান স্যাকসের তথ্য অনুযায়ী, চীনের মূল ভূখণ্ডের এ-শেয়ার ও হংকংয়ের এইচ-শেয়ারের মোট বাজারমূল্যের ৪২ শতাংশ এবং লেনদেনের ৫৭ শতাংশের সঙ্গে এআই খাতের শেয়ার জড়িত। ফলে এই খাতের দরপতনে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

চীনের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে জনপ্রিয় বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রির শেয়ার গত আগস্টে লেনদেন শুরু হওয়ার পর অর্ধেকে নেমে এসেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিটির শেয়ার কেনার জন্য খুচরা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা বরাদ্দের তুলনায় আট হাজার গুণ বেশি ছিল।

চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিএক্সএমটির শেয়ারের দামও গত এক মাসে এক-চতুর্থাংশের বেশি কমেছে। অন্যদিকে, মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটস ও মুর থ্রেডস টেকনোলজির শেয়ার গত বছর বাজারে অভিষেকের সময় যথাক্রমে ৭০০ ও ৪০০ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু গত জুলাই থেকে উভয় কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।

চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় হাইনান প্রদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী চেন ওয়েনশেং জানান, সরকারি সমর্থন রয়েছে- এমন ধারণা থেকেই তিনি শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় বিনিয়োগ করেছিলেন। ইউনিট্রির মতো প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রসমর্থিত তহবিলের বিনিয়োগও তাকে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু এখন তিনি ও তার বন্ধুরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।

বেইজিংয়ের সমর্থন পাওয়া একটি বিনিয়োগ খাতে এমন বড় ধস বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। এর ফলে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার থেকে সরে গিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নতুন শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগও এতে ধীর হয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারে সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কাও চীনের কিছু প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারে চাপ তৈরি করেছে। অপটিক্যাল যন্ত্রাংশ নির্মাতা ঝংজি ইনোলাইট ও ইঅপটোলিংক টেকনোলজির শেয়ারের দাম গত জুন ও জুলাইয়ের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে।

শেয়ারের দাম কমলেও চীনের স্টার ৫০ সূচকের মূল্য-আয় অনুপাত এখনো প্রায় ১০০। একসময় তা প্রায় ২৫০-এ পৌঁছেছিল। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ১০০ সূচকের মূল্য-আয় অনুপাত প্রায় ৩০।

মূল্য-আয় অনুপাতের এই বড় ব্যবধান বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের আশঙ্কা, চীনের প্রযুক্তি শেয়ারগুলোর দাম এখনো কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আয় ও আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় বেশি থাকায় দরপতন আরও গভীর হতে পারে।

হংকংভিত্তিক লোটাস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ও প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হং হাও বলেন, এই পরিস্থিতি অনেক কোম্পানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার উদ্যোগ থামিয়ে দিতে পারে।

শেয়ারবাজারে অস্থিরতা কমাতে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল মুনাফা নিশ্চিত করতে চীনা কর্তৃপক্ষ ঋণনির্ভর বিনিয়োগ ও উচ্চগতির লেনদেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করেছে। বাজারের ঊর্ধ্বগতির সময় রাষ্ট্রসমর্থিত বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করেছেন, যাতে দাম অতিরিক্ত বেড়ে না যায়।

বেইজিংভিত্তিক কিয়ানচুয়াং ক্যাপিটালের অংশীদার লিও ওয়াং বলেন, প্রধান শেয়ারসূচকে বাজারমূল্যের ভিত্তিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে পুঁজির প্রবাহে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। এতে কোনো কোনো খাতে বড় ধরনের বুদ্‌বুদ সৃষ্টি হয়, আবার অন্য খাতগুলো প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়।

চীনের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএসআরসি গত সপ্তাহে রয়টার্সের পাঠানো প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি। তবে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরুর দিকে চেয়ারম্যান উ ছিং পুঁজিবাজারের উন্নয়নে পরামর্শ নিতে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

সব বিশ্লেষক অবশ্য শেয়ারবাজারের এই পতনকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে অতিমূল্যায়িত শেয়ারের দাম সংশোধিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের বাজার সংস্কারের ফলে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা, বিশেষ করে লভ্যাংশ থেকে আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে।

এইচএসবিসির গবেষণা অনুযায়ী, গত তিন মাসে বিক্রির প্রবণতা থাকলেও এশিয়াভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিলগুলোর অনেকেই চীনের শেয়ারে তুলনামূলক বেশি বিনিয়োগ ধরে রেখেছে।

গোল্ডম্যান স্যাকস চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রকাশিত সংশোধিত সুপারিশের তালিকায় ইনোলাইট ও সিএক্সএমটিসহ কয়েক ডজন চীনা এআই কোম্পানিকে রেখেছে। বিএনপি পারিবাস সিকিউরিটিজের কৌশলবিদ উইলিয়াম ব্র্যাটনও সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারে সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে চীনের মূল ভূখণ্ডের অনেক বিনিয়োগকারী এখন অন্য খাতের দিকে নজর দিচ্ছেন। কেউ কেউ শেয়ারের দাম আরও কমার অপেক্ষা করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এআই ও চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও শেষ পর্যন্ত তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। এআই প্রযুক্তির চাহিদা বাড়লেও কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাজার দখলের প্রতিযোগিতা এবং পণ্যের দাম কমানোর চাপ তাদের মুনাফায় প্রভাব ফেলতে পারে।

সাংহাইভিত্তিক ঝুওঝুও ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের অংশীদার ও তহবিল ব্যবস্থাপক ওয়াং ঝুও বলেন, অন্যান্য চীনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মতো চিপ নির্মাতা ও এআই সরবরাহকারীদেরও শেষ পর্যন্ত মূল্যযুদ্ধে নামতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম নেই। সব বুদ্‌বুদই একসময় ফেটে যায়।’

চীনের এআই খাতের শেয়ারবাজারে এই ধস প্রযুক্তি খাতে অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও উচ্চ মূল্যায়নের ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। একদিকে এআই নিয়ে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে, অন্যদিকে সেই প্রবৃদ্ধির বাস্তব চাহিদা ও কোম্পানিগুলোর আয় বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত