ইরানে কেন মসজিদকে টার্গেট করছে বিক্ষোভকারীরা? (ভিডিও)
যে ইরানে মসজিদের মিনার ছিল সার্বভৌমত্বের প্রতীক, আজ সেখানেই জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। রাজধানীর রাজপথ থেকে অলিগলি—বিক্ষোভকারীদের রোষানল থেকে রেহাই পাচ্ছে না ধর্মীয় স্থাপনাও।
১৪তম দিনে পা দিয়ে এক প্রলয়ংকারী রূপ ধারণ করেছে ইরানের বিক্ষোভ। যা শুরু হয়েছিল জ্বালানি ও মুদ্রার অস্বাভাবিক অবমূল্যায়নের প্রতিবাদে, তা এখন রূপ নিয়েছে সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এক দফায়।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা বোঝা যায় ৮,৯ ও ১০ জানুয়ারির রাতের তাণ্ডবে। এই তিন দিন বিক্ষোভকারীরা কেবল রাজপথ দখল করেনি, বরং আক্রোশে পুড়িয়ে দেয় বেশ কয়েকটি ব্যাংক। হাজার হাজার মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যারিকেড ভেঙে একাধিক সরকারি দফতর ঘিরে ফেলে।
তবে চলমান বিক্ষোভে মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। গত কয়েকদিনে ইরানে দুই ডজনেরও বেশি মসজিদে আগুন দেওয়া হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছেন তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি।
জাকানির দাবি, ইরানে একাধিক ব্যাংক লুট করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তর আক্রমণের শিকার হয়েছে। সেই সাথে বিক্ষোভকারীরা ২৫টি মসজিদে আগুন ধরিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন মসজিদের মতো ধর্মীয় স্থাপনাকে টার্গেট করছে বিক্ষোভকারীরা?
ইরানের বিক্ষোভে মসজিদ লক্ষ্যবস্তু হওয়ার প্রধান কারণ হলো দেশটিতে মসজিদের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা। মসজিদগুলোকে কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেকের মতে, ইরানে মসজিদগুলো এখন আর কেবল জনসাধারণের দ্বারা পরিচালিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নেই। কারণ এগুলোকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং প্রতিটি প্রদেশে খতিবদের সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকে নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দেশের অনেক মসজিদে সরকারের অনুগত আধাসামরিক বাহিনী 'বাসিজ'-এর ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। এই বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভ দমনে সরাসরি অংশ নেয়। ফলে মসজিদগুলো বিক্ষোভকারীদের কাছে দমন-পীড়নের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চার দশকেরও বেশি সময়ের লৌহকঠিন শাসনে এমন জনবিস্ফোরণ আগে কখনো দেখা যায়নি। ইরানের সংবিধানের ১৮৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো গোষ্ঠী কিংবা সংগঠন যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে— তাহলে ওই গোষ্ঠীর বা সংগঠনের সব সদস্যকে মোহারেব বা আল্লাহর শত্রু বলে গণ্য করা হবে। এরই মধ্যে ইরানের বিক্ষোভরত জনতাকে ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকার। আর ইরানের সংবিধান অনুযায়ি আল্লাহর শত্রুদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
ইরানের এই সংকট এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক রাজনীতির এক অগ্নিপরীক্ষা। ইরানের ভাগ্য এখন কেবল খামেনির হাতে নয়, বরং রাজপথে থাকা হাজার হাজার মানুষের বজ্রমুষ্টির ওপরও নির্ভর করছে।
বিভি/এমএফআর




মন্তব্য করুন: