বিশ্বজুড়ে ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে লক্ষাধিক মানুষের ঢল
বিশ্বের নানা প্রান্তে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। নির্বাসিত প্রাক্তন শাহের পুত্রের ঘোষিত “বিশ্বব্যাপী কর্মসূচির দিন”–এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) এই বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
জার্মানির মিউনিখে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের সমাবেশে ভাষণ দেন রেজা পাহলভি। তিনি ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা উৎখাতের আহ্বান জানান এবং সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন।
সবচেয়ে বড় জমায়েত হয় মিউনিখ, লস অ্যাঞ্জেলেস ও টরন্টোতে। এছাড়া তেল আবিব, লিসবন, সিডনি ও লন্ডনসহ আরও কয়েকটি শহরেও ছোট-বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
অধিকারকর্মীদের দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর ইরানে ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আরও বহু মৃত্যুর ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে।
সমাবেশে পাহলভি বলেন, “দেশের ভেতরে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াইরত আমাদের সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে আমার বার্তা—আপনারা একা নন। আজকের এই সংগ্রামে বিশ্ব আপনাদের পাশে রয়েছে।”
ইরানের নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “এই দুর্নীতিগ্রস্ত, দমনমূলক ও শিশুহত্যাকারী শাসনের বিপরীতে আপনারাই এক মহান সংস্কৃতি ও প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারী। স্বাধীন ইরান প্রতিষ্ঠিত হলে আপনারাই বিশ্বকে দেখাবেন, আমরা কতটা শক্তিশালী ও গর্বিত জাতি।”
লস অ্যাঞ্জেলেসের এক সমাবেশে বক্তব্য দেন পাহলভির কন্যা নুর পাহলভি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম CBS News–এর বরাতে তিনি বলেন, ইরানিরা “এই ইসলামী শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার এতটা কাছাকাছি আগে কখনও পৌঁছায়নি।”
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান, ইরানের নেতৃত্বের সঙ্গে চলমান পারমাণবিক আলোচনা বন্ধ করতে। তার ভাষায়, এটি “খুনিদের সঙ্গে আলোচনা।”
শুক্রবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে সেটিই হবে “সবচেয়ে ইতিবাচক ঘটনা।” তবে তিনি পাহলভিকে সরাসরি সমর্থন করেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। গত মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, পাহলভি “খুব ভালো মানুষ” মনে হলেও ইরানের ভেতরে পর্যাপ্ত সমর্থন তিনি পাবেন কি না, সে বিষয়ে তার সংশয় রয়েছে।
টরন্টোতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকে বিবিসি পার্সিয়ানকে জানান, ইরানে থাকা স্বজনদের হয়ে কথা বলতেই তারা রাস্তায় নেমেছেন।
ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভের সূচনা হয়। প্রথমে তা অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও দ্রুতই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশে রূপ নেয়।
প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে দেশের সব প্রদেশের শতাধিক শহর ও নগরে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (Human Rights Activists News Agency) জানিয়েছে, বিক্ষোভে ৬ হাজার ৮৭২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৫০ জনের বেশি শিশু।
অন্যদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ অন্তত ৩ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছে, নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন।
দেশের ভেতরে অনেক বিক্ষোভকারী পাহলভির নামে স্লোগান দিচ্ছেন এবং তাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে তার পিতার রাজতন্ত্রের পতনের সময় পাহলভির বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। প্রায় পাঁচ দশক পর তিনি আবারও ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন রয়ে গেছে—পাহলভির কল্পিত ইরান কি সত্যিই একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে?
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: