• NEWS PORTAL

  • বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষিত মাদক সম্রাট কে এই ‘এল মেনচো’?

প্রকাশিত: ১১:৩৯, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আপডেট: ১৩:২৮, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ফন্ট সাইজ
১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষিত মাদক সম্রাট কে এই ‘এল মেনচো’?

মেক্সিকোর সবচেয়ে মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তি এবং ভয়ংকর মাদক কার্টেল জালিস্কো নিউ জেনারেশন (সিজেএনজি)-এর প্রধান নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সার্ভান্তেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত, গ্রেপ্তারকালে সামরিক অভিযানে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ তার গ্রেপ্তার বা ধরিয়ে দেওয়ার তথ্যের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ মিলিয়ন ডলার (১ কোটি ৫০ লাখ) পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) জালিস্কোর তাপালপা এলাকায়—গুয়াদালাহারা শহর থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ—তাকে ধরতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে তিনি আহত হন এবং মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয় বলে দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়।

সিজেএনজি প্রধানকে ধরার এই অভিযানকে মেক্সিকো সরকারের অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে কার্টেলবিরোধী কঠোর অবস্থানের বার্তা দিতে চেয়েছিল মেক্সিকো। তবে অভিযানের জেরে কার্টেল সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখায়। সদস্যরা প্রায় এক ডজন অঙ্গরাজ্যে গাড়িতে আগুন দিয়ে সড়ক অবরোধ করে, ফলে বিভিন্ন স্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

জালিস্কোর রাজধানী গুয়াদালাহারা তার মৃত্যুর পর কার্যত অচল হয়ে পড়ে; আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ঘরবন্দি হয়ে যান। জালিস্কো রাজ্যই সিজেএনজি কার্টেলের ঘাঁটি—যারা যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ ফেন্টানিলসহ বিভিন্ন মাদক পাচারের জন্য কুখ্যাত। সহিংসতার কারণে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সোমবার স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

কে এই এল মেনচো?

৬০ বছর বয়সী সার্ভান্তেস ছিলেন সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা। সরকার বাহিনী ও প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে রক্তাক্ত ইতিহাসের জন্য তিনি কুখ্যাত ছিলেন।

১৯৬৬ সালে তিনি পশ্চিম মেক্সিকোর মিচোয়াকান অঙ্গরাজ্যের এক দরিদ্র পাহাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে আফিম ও গাঁজা চাষের জন্য পরিচিত, যেখানে অ্যাভোকাডো উৎপাদনের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা চলে আসছে। তরুণ বয়সে তিনি অ্যাভোকাডোর খেতে কাজ করতেন। পরে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে যান, যেখানে প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি হেরোইন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হয়ে কয়েক বছর কারাদণ্ড ভোগের পর তাকে মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফিরে তিনি প্রথমে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন, পরে সিনালোয়া কার্টেলের সহযোগী ‘মিলেনিও কার্টেল’-এ যুক্ত হন।

‘সিকারিও’ (কার্টেল ঘাতক) হিসেবে কাজ করার পর তিনি কার্টেলের শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসেন। মিলেনিও কার্টেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি আলাদা হয়ে যান এবং স্থানীয় অর্থপাচারকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট বেঁধে সিজেএনজি প্রতিষ্ঠা করেন। একই সঙ্গে তিনি সিনালোয়া কার্টেলের বিরুদ্ধে সংঘাত শুরু করেন।

‘এল মেনচো’ নামটি তার নাম ‘নেমেসিও’-এর ধ্বনিগত রূপ থেকে এসেছে। তার আরেকটি ডাকনাম ছিল ‘দ্য লর্ড অব দ্য রুস্টারস’, যা মোরগ লড়াইয়ের প্রতি তার আগ্রহ থেকে এসেছে।

তার কার্টেলের নাম রাখা হয় জালিস্কো অঙ্গরাজ্যের নাম অনুসারে, যেখানে গুয়াদালাহারা শহর অবস্থিত। বছরের পর বছর ধরে এই কার্টেল যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ মাদক—বিশেষ করে সিন্থেটিক ওপিওয়েড ফেন্টানিল—পাচারের জন্য দায়ী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেন্টানিল-সংক্রান্ত অতিমাত্রায় সেবনে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

সিজেএনজি কার্টেল সিনালোয়া কার্টেলের মাদক পাচারের কৌশল ও জনসম্পৃক্ততার মডেলের সঙ্গে জেটাস কার্টেলের চরম সহিংস পদ্ধতির সমন্বয় ঘটায়। জেটাস ছিল একটি কুখ্যাত গ্যাং, যারা আধাসামরিক কৌশল ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও অপহরণের মতো অপরাধ পরিচালনা করত।

অল্প সময়ের মধ্যেই সার্ভান্তেস সিজেএনজি-কে শক্তিশালী অপরাধ সাম্রাজ্যে পরিণত করেন, যা তার সাবেক মিত্র সিনালোয়া কার্টেলের সমকক্ষ হয়ে ওঠে। ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পুরস্কার ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও তিনি বহু বছর গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান।

সিনালোয়া কার্টেলের গ্রেপ্তার হওয়া কুখ্যাত নেতা জোয়াকিন ‘এল চ্যাপো’ গুজমানের পর সার্ভান্তেসকে মেক্সিকোর সবচেয়ে প্রভাবশালী অপরাধ বস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে গুজমান যেখানে গণমাধ্যমে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন, সেখানে এল মেনচো আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া অডিও বার্তায় তিনি শত্রু ও কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে আলোচনায় আসেন।

গ্রেপ্তারের ব্যর্থ চেষ্টা

এল মেনচো নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্যও পরিচিত ছিলেন। বহু বছর ধরে তিনি পুলিশকে ঘুষ দিয়ে প্রায় দায়মুক্তির সঙ্গে জালিস্কোতে কার্যক্রম চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সুরক্ষাও পেয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

২০১৫ সালের মে মাসে, মেক্সিকান বাহিনী যখন তাকে ঘিরে ফেলেছিল, তখন তার সহযোগীরা রকেটচালিত গ্রেনেড ছুড়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে, যাতে তিনি পালানোর সুযোগ পান।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠিত অপরাধ বিশেষজ্ঞ এডগার্দো বুসকাগ্লিয়া বলেন, “এল মেনচোর সিজেএনজি ছিল রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম বড় অর্থদাতা, যা তাদের শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।”

২০২০ সালের করোনাভাইরাস মহামারির সময় প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, সরকারি কর্মীদের পরিবর্তে কার্টেল সদস্যরা সিজেএনজি চিহ্নিত খাদ্যপ্যাকেট বিতরণ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল জনসমর্থন অর্জনের কৌশল।

বুসকাগ্লিয়ার ভাষায়, “মেক্সিকান সরকারের তুলনায় অনেকের কাছে সে-ই ছিল কম খারাপ বিকল্প।”

নৃশংসতার চিত্র

তার প্রতিপক্ষরা অবশ্য এতটা ভাগ্যবান ছিল না। তার গ্যাং নিয়মিতভাবে শিরশ্ছেদসহ ভয়াবহ সহিংসতার আশ্রয় নিত। ২০১৫ সালে মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে পশ্চিম মেক্সিকোয় তারা দুই ডজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে।

২০২০ সালে মেক্সিকো সিটির তৎকালীন পুলিশপ্রধান ওমর গার্সিয়া হারফুচের ওপর হামলা চালানো হয়, যাতে তার দুই দেহরক্ষী নিহত হন। ওই হামলার জন্য সিজেএনজি-কে দায়ী করা হয়। বর্তমানে হারফুচ দেশটির নিরাপত্তাপ্রধান এবং সার্ভান্তেসবিরোধী অভিযানে তিনি ভূমিকা রাখেন।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ভান্দা ফেলবাব-ব্রাউন বলেন, “সিনালোয়া কার্টেলের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি এল মেনচো বহু বছর ধরে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দীর্ঘদিন তাকে ধরার চেষ্টা করেছে—এতদিন তিনি যেভাবে পালিয়ে ছিলেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর।”

কে এই ‘এল মেনচো’? ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কারঘোষিত মোস্ট ওয়ান্টেড ড্রাগলর্ড

এনডিটিভি

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত