• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

বিশ্বে আমেরিকার প্রায় ৮০০ সামরিক ঘাঁটি

রফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২০:০৩, ৯ মার্চ ২০২৬

ফন্ট সাইজ
বিশ্বে আমেরিকার প্রায় ৮০০ সামরিক ঘাঁটি

সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮০০ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরাকে যেসব ঘাঁটি এখনো চালু রয়েছে সেগুলোকে হিসাবের মধ্যে ধরলে এ সংখ্যা আরও বেশি হবে। বিশ্বব্যাপী এসব ঘাঁটি পরিচালনার জন্য প্রতি বছর প্রায় ১৫৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়।

মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ডেভিড ভাইন তাঁর ‘Base Nation’ গ্রন্থে এবং রাশিয়ার বার্তা সংস্থা স্পুৎনিকের তথ্য অনুযায়ী এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ‘Base Nation’ গ্রন্থে অধ্যাপক ভাইন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার ফলে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি, পরিবেশগত প্রভাব এবং মানবজীবনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটছে তার একটি হিসাব তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

অবাক করা তথ্য হলো—২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বিস্তারের কাজ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে সারা বিশ্বে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অধিকাংশই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয় এবং জাপান ও জার্মানিতে শান্তিরক্ষীর দায়িত্ব পালন শুরু করে। কোরীয় উপদ্বীপের যুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধও বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কমিউনিজম বিস্তারের আশঙ্কা দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতগতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে তার ভূরাজনৈতিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব কমানোর চেষ্টা চালায়।

জাপান, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে গণতন্ত্র সুসংহত হলেও সেখানে এখনও বহু মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হলেও যুক্তরাষ্ট্র তার এসব ঘাঁটি অক্ষত রেখেছে এবং সেখানে সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

কার অর্থে পরিচালিত হয় এসব ঘাঁটি?

মার্কিন সরকার সারা বিশ্বে প্রায় ৮০০ সামরিক ঘাঁটি পরিচালনার জন্য আমেরিকার জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করে। সেই অর্থেই এসব ঘাঁটি পরিচালিত হয়। স্পুৎনিকের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে মোতায়েন একজন মার্কিন সেনার জন্য করদাতাদের বছরে প্রায় ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়।

পরোক্ষভাবে বিশ্বের বহু দেশের জনগণও এ ব্যয়ের বোঝা বহন করে। কারণ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এসব আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের কারণে অনেক দেশই পরোক্ষভাবে এই ব্যয়ের অংশীদার হয়ে যায়।

অন্যদিকে, বিভিন্ন দেশে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে একাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানেও মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন অভিযানের সময় নির্যাতন, নির্বিচারে গুলি চালানো এবং বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন এসব সামরিক ঘাঁটি?

স্থল, নৌ ও বিমানঘাঁটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে ব্যাপক সামরিক তৎপরতা চালিয়ে থাকে। এর মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখতে চায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এসব ঘাঁটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে চায় এবং বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করে।

যেসব দেশে মার্কিন নীতির বিরোধিতা দেখা যায়, সেখানে কখনো সামরিক অভিযান, কখনো রাজনৈতিক বা গোপন কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয় বলে সমালোচকরা মনে করেন।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে বিভিন্ন দেশে নতুন করে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৮০টি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটির জন্য প্রায় ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি ভবন ও স্থাপনা রয়েছে এবং মোট প্রায় তিন কোটি একর জমি ব্যবহৃত হচ্ছে। সে হিসাবে পেন্টাগন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভূমির মালিক।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা খনিজ সম্পদ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাজারের ওপর প্রভাব বজায় রাখাও যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় কৌশলগত লক্ষ্য বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

কোন দেশে কত ঘাঁটি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান, জার্মানি ও ইতালি ছিল একই পক্ষে এবং তারা পরাজিত হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় ৭০ বছর পরও জার্মানিতে ১৭২টি, ইতালিতে ১১৩টি এবং জাপানে ৮৪টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

কোরীয় উপদ্বীপের যুদ্ধ শেষ হয়েছে প্রায় ৬৭ বছর আগে। এত বছর পরও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৮৩টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, বুলগেরিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, সৌদি আরব, কাতার ও কেনিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।

ইরানকে ঘিরে মার্কিন ঘাঁটি

আঞ্চলিক মানচিত্রে দেখা যায়, ইরানের আশপাশে বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ২০২১ সালের শেষ দিকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগে ইরানের দুই পাশে অন্তত ১৯টি মার্কিন ঘাঁটি ছিল। মধ্য এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে বিবেচনায় নিলে ইরানকে ঘিরে থাকা মার্কিন ঘাঁটির সংখ্যা প্রায় ২৫টি বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া গোপন ঘাঁটিও রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্লোবাল রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৫৬টি দেশে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করে রেখেছে। প্রয়োজন হলে এসব সেনা বিশ্বের যেকোনো স্থানে অভিযান পরিচালনা করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের কাতার শাখার ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল স্টাডিজ’-এর পরিচালক মেহরান কামরাভা উল্লেখ করেছেন, তিনটি প্রধান কারণে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে—মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করা, ইসরাইলের নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করা।

ইরানের দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন বিমান, স্থল, নৌ ও মেরিন বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। পশ্চিমে তুরস্ক ও ইসরাইলে মার্কিন সেনা রয়েছে। এছাড়া উত্তরে তুর্কমেনিস্তান ও কিরগিজস্তান এবং পূর্বে পাকিস্তানেও মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। ইরানের প্রতিবেশী দেশ কুয়েতে রয়েছে মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে রয়েছে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর।

এই পঞ্চম নৌবহরে প্রায় ১৬ হাজার সেনা এবং প্রায় ৪০টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে নিয়মিতভাবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ টহল দিয়ে থাকে। সৌদি আরবেও মার্কিন বিমান বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্রিটেনেরও সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই দুই দেশের কৌশলগত স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।


লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

মন্তব্য করুন:

সর্বাধিক পঠিত