‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিচ্ছে ইরান? (ভিডিও)
আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান—যুদ্ধেরর ময়দানে সবই যেন থমকে যাচ্ছে। শত্রুকে হাজারটা ছোট ছোট ক্ষত দিয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানোই যেন এখন ইরানের প্রধান লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য অর্জনে দেশটির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার 'মোজাইক ডিফেন্স'।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ মোকাবিলায় ইরান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সুচিন্তিত কৌশল গ্রহণ করেছে। ইরানের মূল লক্ষ্য এই যুদ্ধ নিজেদের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে মার্কিন ব্যয় বৃদ্ধি করে ট্রাম্পকে হটানোর কৌশল নিয়েছে ইরান।
ইসরাইল ও মার্কিন বাহিনীকে পিছু হটাতে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশল নিয়েছে ইরান। মোজাইকের ছোট ছোট খণ্ডের সঙ্গে তুলনাযোগ্য ইরানে প্রতিটি প্রদেশকে একেকটি স্বাধীন প্রতিরক্ষা ইউনিটে রূপ দিতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- যুদ্ধকালীন কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থা ধ্বংস বা বিচ্ছিন্ন হলেও যাতে ইরানের প্রতিটি প্রদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব শক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
গত সপ্তাহে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউইয়র্কভিত্তিক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা দ্য সুফন সেন্টার। যেখানে বলা হয়, গত কয়েক মাসে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর একের পর এক হামলার পরও তাদের ড্রোন এবং মিসাইল হামলার সক্ষমতা কমেনি। এটিই প্রমাণ করে যে, তাদের ‘মোজাইক কৌশল’ কার্যকর।
এই বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোটি কেবল ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং লেবানন, ইয়েমেন এবং ইরাকের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে একেকটি গোষ্ঠী একেকটি ‘মোজাইক টুকরো’ হিসেবে কাজ করে, যা পুরো অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। আর এক্ষেত্রে এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স বড় ভূমিকা রাখছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠী ইরানের জন্য একটি ‘প্রতিরক্ষা বলয়’ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হানিন গাদ্দার বলেন, ''এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স' বা প্রতিরোধ অক্ষ এমন একটি জোট, যা মূলত ইরান সরকার—ও আইআরজিসি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে তুলেছে। আইআরজিসি-র অধীনেই তৈরি হয়েছিল 'কুদস ফোর্স'। যাদের প্রধান কাজই হলো এই পুরো অক্ষ বা জোটটিকে পরিচালনা করা। কাসেম সোলাইমানির নেতৃত্বে কুদস ফোর্স যখন তাদের স্বর্ণযুগে ছিল, তখন এই অক্ষের শক্তি ছিল তুঙ্গে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যখন সোলাইমানি নিহত হন, সেটিই ছিল এই জোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সময়।''
এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো ইরান সরকারকে শক্তিশালী করা এবং সুরক্ষা দেওয়া। একাধিক ফ্রন্টে প্রভাবশালী নেতাদের হারালেও জোটটি ভেঙ্গে পড়েনি বলে মনে করছেন শিয়া রাজনীতি নিয়ে কাজ করা এই বিশেষজ্ঞ।
''এই মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো একদিকে যেমন ইরানের শাসন ব্যবস্থাকে রক্ষা ও শক্তিশালী করে, তেমনি তারা যেখানে অবস্থিত সেই রাজধানীগুলোতেও নিজেদের সশস্ত্র শক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। যদিও সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং লেবাননে নাসরুল্লাহকে হারানোর ফলে এই অক্ষ বা জোটটিতে ভাঙন ধরতে শুরু করেছে। তবে এটি এখনো টিকে আছে এবং পুরোপুরি ধসে পড়েনি।''
ইরানের প্রদেশগুলোর প্রশাসনিক প্রধান প্রত্যেকের কাছে নিজস্ব অস্ত্রাগার, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে শত্রুপক্ষ রাজধানী দখল করলেও প্রতিটি শহর বা পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের শত শত ক্ষুদ্র ও বিধ্বংসী ইউনিটের মুখোমুখি হতে হবে।
প্রথাগত যুদ্ধে সাধারণত প্রতিপক্ষের ‘সেন্টার অফ গ্রাভিটি’ বা প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে আঘাত করে তাদের হারানো হয়। কিন্তু মোজাইক ডিফেন্সের কারণে কোনো নির্দিষ্ট একটি জায়গায় হামলা চালিয়ে ইরানকে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব নয়। এটি অনেকটা একটি জাল বা নেটওয়ার্কের মতো, যার এক প্রান্ত ছিঁড়লেও অন্য প্রান্তগুলো সক্রিয় থাকে।
বিভি/এমএফআর



মন্তব্য করুন: