• NEWS PORTAL

  • সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

সরকারই খুঁজে দেবে জীবনসঙ্গী! জন্মহার বাড়াতে সিঙ্গাপুরের অভিনব উদ্যোগ

প্রকাশিত: ১১:৪৮, ৫ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১১:৫৪, ৫ অক্টোবর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
সরকারই খুঁজে দেবে জীবনসঙ্গী! জন্মহার বাড়াতে সিঙ্গাপুরের অভিনব উদ্যোগ

জন্মহার বাড়াতে এবার শুধু আর্থিক প্রণোদনা নয়, অবিবাহিতদের জীবনসঙ্গী খুঁজে দেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার। দেশটির সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘ফার্স্টডেট’ নামে একটি ডেটিং প্ল্যাটফর্ম। নোবেল পুরস্কারজয়ী অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এই প্ল্যাটফর্মে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর সঙ্গে সরকারি কর্মীদের মিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার মধ্যেই সরকারের এমন উদ্যোগ নিয়ে চলছে আলোচনা।

৩০ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা নুর আয়েশা কয়েক বছর ধরে জীবনসঙ্গীর খোঁজ করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্র কিংবা শখের জায়গায় নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ খুব কম। টিন্ডার ও বাম্বলের মতো ডেটিং অ্যাপও তাঁর পছন্দ নয়। তাঁর ভাষ্য, সম্ভাব্য সঙ্গীদের কেউ প্রোফাইল তৈরিতে তেমন আগ্রহ দেখান না, আবার কেউ বার্তালাপ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও খুব একটা স্বচ্ছন্দ নন।

নুর সন্তান নিতে আগ্রহী। তবে সন্তান লালন-পালনের খরচ নিয়েও তাঁর উদ্বেগ রয়েছে। সিঙ্গাপুরে আবাসন ও শিশুর যত্নের ব্যয় অনেক বেশি। পাশাপাশি সন্তান দেখাশোনার বড় দায়িত্ব সাধারণত নারীদের ওপরই পড়ে। আল-জাজিরাকে নুর বলেন, সামগ্রিকভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশাবাদী।

এই পরিস্থিতিতে কৌতূহল থেকেই গভটেকের ‘ফার্স্টডেট’ প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন করেন নুর। গভটেকের বার্ষিক হ্যাকাথনের অংশ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে প্ল্যাটফর্মটি। বর্তমানে ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অবিবাহিত সরকারি কর্মীদের নিয়ে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীরা জাতীয় ডিজিটাল পরিচয় ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করেন। এরপর তাঁদের আগ্রহ, অভ্যাস ও মূল্যবোধ নিয়ে একটি প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে একবারে একজন সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে তাঁদের মিলিয়ে দেওয়া হয়। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে নিবন্ধনের সময়সীমা সোমবার শেষ হয়েছে। সরকারি সংস্থার বাইরে সেবাটি সম্প্রসারণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সিঙ্গাপুরের ক্রমহ্রাসমান জন্মহার। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৩০ হাজারেরও কম শিশু জন্মেছে। এতে মোট প্রজনন হার নেমে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ০ দশমিক ৮৭-এ।

পরিবারকে সন্তান নেওয়ায় উৎসাহিত করতে গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং নতুন কয়েকটি পদক্ষেপ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে প্রতিটি শিশুর জন্ম থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে উপপ্রধানমন্ত্রী গান কিম ইয়ং সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০৪০-এর দশকের শুরুতেই দেশটির নাগরিক জনসংখ্যা কমতে শুরু করতে পারে। এতে বয়স্কদের দেখভালের জন্য কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাও কমে যাবে। শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে আগামী পাঁচ বছরে প্রতিবছর ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার নতুন নাগরিক নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

প্রেম ও বিয়ের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ অবশ্য সিঙ্গাপুরে নতুন নয়। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউর একটি বক্তব্যের পর ‘গ্রেট ম্যারেজ ডিবেট’-এর সূত্রপাত হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষিত মায়েদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তিতে অগ্রাধিকার দিতে ‘গ্র্যাজুয়েট মাদার্স স্কিম’ চালু করা হয়। অবিবাহিতদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে গঠন করা হয় ‘সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইউনিট’।

‘ফার্স্টডেট’-এ ব্যবহার করা হচ্ছে গণিতবিদ ডেভিড গেল ও লয়েড শ্যাপলির ১৯৬২ সালে তৈরি ‘গেল-শ্যাপলি অ্যালগরিদম’। দুই পক্ষের পছন্দের তালিকার ভিত্তিতে জুটি তৈরি করে এই অ্যালগরিদম। ২০১২ সালে এই অ্যালগরিদম আবিষ্কারের জন্য শ্যাপলি অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার পান।

সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক জিন লিউর মতে, প্রচলিত ডেটিং অ্যাপের মতো অসংখ্য প্রোফাইল দেখার পরিবর্তে ‘ফার্স্টডেট’ একবারে একজন সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে ব্যবহারকারীর মিল ঘটায়। তবে শুধু প্রশ্নপত্রের উত্তর দিয়ে দুজন মানুষের সম্পর্ক কতটা সফল হবে, তা নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন বলেও মনে করেন তিনি। খুব কম মানুষ অংশ নিলে এই পদ্ধতি কার্যকর নাও হতে পারে।

উদ্যোগটি নিয়ে গোপনীয়তার প্রশ্নও উঠেছে। সরকারি কর্মকর্তা জেমি জানতে চেয়েছেন, জুটি তৈরির জন্য কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে। ‘ফার্স্টডেট’-এর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর প্রোফাইল শুধু তাঁর সঙ্গে মিল পাওয়া ব্যক্তি দেখতে পারবেন। উভয় পক্ষ সম্মত হলেই যোগাযোগের তথ্য শেয়ার করা হবে এবং আইনগত প্রয়োজন ছাড়া তথ্য বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হবে না।

পিএইচডি গবেষক ও সাবেক ‘স্ট্রেইটস টাইমস’ সাংবাদিক তেও কাই শিয়াংয়ের মতে, পছন্দের তালিকা ও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে প্রেমের সঙ্গী নির্ধারণের চেষ্টা ভালোবাসাকে লেনদেনভিত্তিক করে তুলতে পারে। তাঁর মতে, ডেটিংয়ের বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাড়িভাড়া ও যাতায়াতের উচ্চ খরচ। সিঙ্গাপুরে অবিবাহিতরা একা সরকারি আবাসন কিনতে পারেন না, যতক্ষণ না তাঁদের বয়স ৩৫ বছর হয়।

সিঙ্গাপুরই অবশ্য এমন উদ্যোগ নেওয়া প্রথম দেশ নয়। ২০২৪ সালে টোকিওর মহানগর সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত ‘টোকিও এনমুসুবি’ ডেটিং অ্যাপ চালু করে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল সরকারও ‘সিউলটিং’ কর্মসূচির মাধ্যমে অবিবাহিতদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে সিঙ্গাপুরের ‘ফার্স্টডেট’ কতটা মানুষকে জীবনসঙ্গী খুঁজে পেতে সাহায্য করবে এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির জন্মহার বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: আলজাজিরা

বিভি/পিএইচ

মন্তব্য করুন: