হার্ট অ্যাটাক ঠেকাতে পারেনি নোভার্টিসের ওষুধ, নোভো নরডিস্কও ব্যর্থ!
ছবি: রয়টার্স
হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে তৈরি দুটি পরীক্ষামূলক ওষুধ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ব্যর্থ হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নোভার্টিসের পেলাকারসেন রক্তে হৃদ্রোগের জিনগত ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ কণার মাত্রা ৭৮ শতাংশ কমালেও হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধে কোনো সুফল দেখাতে পারেনি।
অন্যদিকে, ডেনমার্কের নোভো নরডিস্কের প্রদাহনাশক ওষুধ জিলটিভেকিমাব শরীরের প্রদাহ কমাতে সক্ষম হলেও মৃত্যু, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। দুটি গবেষণার ফল প্রকাশের পর হৃদ্রোগের চিকিৎসায় নতুন ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়, নোভার্টিসের পরীক্ষামূলক ওষুধটির নাম পেলাকারসেন। হৃদ্রোগের জিনগত ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত লিপোপ্রোটিন (এ) বা এলপি(এ)-এর মাত্রা কমানোর উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাসে একবার পেলাকারসেন প্রয়োগে এলপি(এ)-এর মাত্রা ৭৮ শতাংশ কমেছে। তবে প্রায় পাঁচ বছর ধরে ওষুধটি ব্যবহারের পরও দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমেনি। স্ট্রোক কিংবা ধমনিতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
৮ হাজার ৩০০-এর বেশি রোগীকে নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণার বিস্তারিত ফল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এএইচএ) সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণার ফল উপস্থাপন করেন ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের চিকিৎসক স্টিভেন নিসেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সবাই, আমিও ভেবেছিলাম ওষুধটি কার্যকর হবে।’ তবে ফলাফলে কোনো সুফল না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওষুধটি কার্যত কোনো প্রভাবই ফেলেনি।
গত সেপ্টেম্বরে নোভার্টিস ও ওষুধটির সহ-উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান আয়োনিস ফার্মাসিউটিক্যালস জানিয়েছিল, পেলাকারসেন গবেষণার প্রধান লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে ওষুধটি অন্য কোনো ক্ষেত্রে উপকার করে কি না, তা জানতে গবেষক ও বিনিয়োগকারীরা বিস্তারিত ফলের অপেক্ষায় ছিলেন।
অন্যদিকে, নোভো নরডিস্কের জিলটিভেকিমাব নামের একটি প্রদাহনাশক ওষুধের পরীক্ষাতেও হতাশাজনক ফল পাওয়া গেছে। ওষুধটি হৃদ্রোগীদের শরীরের প্রদাহ কমাতে সক্ষম হলেও মৃত্যু, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে পারেনি।
বর্তমানে রক্তে এলপি(এ)-এর মাত্রা বেশি থাকা রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এটি হৃদ্রোগের একটি জিনগত ঝুঁকির কারণ। ধারণা করা হয়, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের শরীরে এলপি(এ)-এর মাত্রা বেশি। তবে তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই বিষয়টি জানেন।
গবেষকদের ধারণা ছিল, এলপি(এ)-এর মাত্রা কমানো গেলে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ স্ট্যাটিনের মতোই হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। স্ট্যাটিন রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএলের মাত্রা কমিয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
পেলাকারসেনের গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়। এক দলকে প্রতি মাসে ৭০ মিলিগ্রাম পেলাকারসেন এবং অন্য দলকে ওষুধের পরিবর্তে প্লাসিবো দেওয়া হয়। গড়ে ৪ দশমিক ৭ বছর তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। অংশগ্রহণকারীদের সবারই আগে বড় ধরনের কোনো হৃদ্রোগজনিত ঘটনা, যেমন হার্ট অ্যাটাকের অভিজ্ঞতা ছিল। পাশাপাশি তাদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের মতো অন্যান্য ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল।
এরপরও ওষুধটি উল্লেখযোগ্য কোনো সুফল দিতে পারেনি। বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে পেলাকারসেন গ্রহণকারী ২০ দশমিক ৬ শতাংশ রোগী ওষুধ নেওয়া বন্ধ করে দেন। প্লাসিবো গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
গবেষণার ফল নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন এভিডেন্সে প্রকাশিত পৃথক পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণেও ওষুধটির কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওই বিশ্লেষণে যেসব রোগীর শরীরে প্রথম তিন মাসে গড়ের চেয়ে বেশি এলপি(এ) কমেছিল, তাদের তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণা থেকে বাদ না পড়া রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করেও কোনো সুফল মেলেনি।
তবে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডোনাল্ড লয়েড-জোনস মনে করেন, আরও বিস্তৃত গবেষণার ফল না পাওয়া পর্যন্ত এলপি(এ)-কে হৃদ্রোগের কারণ বা চিকিৎসার লক্ষ্য হিসেবে বাতিল করা উচিত হবে না।
পেলাকারসেন এমন এক ধরনের ওষুধ, যাকে বলা হয় অ্যান্টিসেন্স অলিগোনিউক্লিওটাইডস বা এএসও। ত্রুটিপূর্ণ জিন থেকে তৈরি হওয়া প্রোটিনের উৎপাদন কমিয়ে কাজ করে এ ধরনের ওষুধ।
এলপি(এ)-এর মাত্রা কমানোর জন্য আরও কয়েকটি পরীক্ষামূলক ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে অ্যামজেনের ওলপাসিরান এবং এলি লিলির লেপোডিসিরান উল্লেখযোগ্য। এগুলো স্মল ইন্টারফেরিং আরএনএ বা সিআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি। গবেষণায় দেখা গেছে, ওষুধ দুটি এলপি(এ)-এর মাত্রা প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
পেলাকারসেনের গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া চিকিৎসক স্টিভেন নিসেনের মতে, এলপি(এ) যে হৃদ্রোগের অন্যতম বড় কারণ, তার পক্ষে এখনো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তার ধারণা, বিভিন্ন ওষুধের কার্যপদ্ধতি ও গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের মধ্যে পার্থক্যের কারণে ভবিষ্যতের পরীক্ষায় ভিন্ন ফল আসতে পারে।
তিনি জানান, পেলাকারসেনের গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সবারই আগে বড় ধরনের হৃদ্রোগজনিত ঘটনা ঘটেছিল। অন্যদিকে এলি লিলি ও অ্যামজেনের গবেষণায় এমন অনেক রোগী রয়েছেন, যাদের আগে কখনো হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়নি।
নিসেন আরও বলেন, সিআরএনএ প্রযুক্তিতে তৈরি ওষুধগুলো তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সহনীয় এবং কার্যকারিতার দিক থেকেও এগিয়ে। তবে এতে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ফল ভালো হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অ্যামজেনের তৃতীয় পর্যায়ের গবেষণার ফল ২০২৮ সালের শুরুর দিকে এবং এলি লিলির গবেষণার ফল ২০২৯ সালে প্রকাশিত হওয়ার কথা।
হৃদ্রোগের সঙ্গে শরীরের প্রদাহের সম্পর্ক ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেনস হাসপাতালের চিকিৎসক পল রিডকার শনিবার (৭ নভেম্বর) নোভো নরডিস্কের জিলটিভেকিমাবের গবেষণার ফল উপস্থাপন করেন।
ওষুধটি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা হৃদ্রোগীদের শরীরের প্রদাহ কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রদাহ সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ইন্টারলিউকিন-৬ (আইএল-৬)-এর কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় করাই এর লক্ষ্য।
হৃদ্রোগ, কিডনির জটিলতা এবং শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ রয়েছে- এমন ৬ হাজার ৩০০ রোগীকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গত জুলাইয়ে নোভো নরডিস্ক জানায়, ওষুধটি প্রদাহ কমাতে পারলেও প্লাসিবোর তুলনায় মৃত্যু, হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে পারেনি।
এ ফল ওষুধ বিশেষজ্ঞদের অনেককে বিস্মিত করে। ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধের জন্য পরিচিত নোভো নরডিস্কের হৃদ্রোগের চিকিৎসায় ব্যবসা সম্প্রসারণের আশাও এতে ধাক্কা খায়।
এরপর গত ৭ সেপ্টেম্বর একটি স্বাধীন তথ্য পর্যবেক্ষণ কমিটির সুপারিশে জিলটিভেকিমাব নিয়ে আরও দুটি শেষ পর্যায়ের গবেষণা বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ওই কমিটির মূল্যায়ন ছিল, হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতা ও প্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে পরিচালিত গবেষণা দুটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
গবেষক পল রিডকারের ধারণা, জিলটিভেকিমাব এমন একদল রোগীর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে, যাদের রোগ অনেক বেশি অগ্রসর হয়ে গিয়েছিল। ফলে প্রদাহ কমানোর চিকিৎসায় তাদের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তবে তার মতে, হৃদ্রোগের চিকিৎসায় প্রদাহকে লক্ষ্য করে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে।
গবেষণায় অংশ না নেওয়া ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) চিকিৎসক প্রিসিলা হসু বলেন, জিলটিভেকিমাবের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া রোগীরা অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। তাদের ক্ষেত্রে প্রদাহ ইতিমধ্যে বড় ধরনের ক্ষতি করে থাকতে পারে।
দুটি ওষুধের গবেষণায় একই ধরনের হতাশাজনক ফলের বিষয়ে ডোনাল্ড লয়েড-জোনস বলেন, ভিন্ন ধরনের ওষুধ ও চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করে আরও গবেষণা চালানো প্রয়োজন।
সূত্র: রয়টার্স
বিভি/পিএইচ













মন্তব্য করুন: