• NEWS PORTAL

  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যে অভ্যাসে কমে একাকিত্ব, বাড়ে মানসিক সুস্থতা—বলছে গবেষণা

প্রকাশিত: ২৩:১৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফন্ট সাইজ
যে অভ্যাসে কমে একাকিত্ব, বাড়ে মানসিক সুস্থতা—বলছে গবেষণা

প্রতীকী ছবি

ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কিংবা অবসর কাটাতে অনেকেই বই পড়েন। কিন্তু বই পড়া শুধু বিনোদন বা সময় কাটানোর মাধ্যম নয়; নিয়মিত পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুস্থতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, নিয়মিত বই পড়লে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়তে পারে, মানসিক চাপ কমতে পারে এবং অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা বা সহমর্মিতা তৈরি হয়। এমনকি একাকিত্ব কমাতেও বই পড়ার ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে কাগজের বই পড়ার সময় দীর্ঘক্ষণ একটি বিষয়ের ওপর মনোযোগ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়, যা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সহায়ক।

কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত গবেষণা এবং জীবনযাপনবিষয়ক পোর্টাল রিয়েল সিম্পল-এ মার্কিন গবেষক লিসা মিলব্র্যান্ডের বিশ্লেষণে বই পড়ার এসব উপকারিতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক
গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলা থেকে বই পড়ার অভ্যাস থাকলে ভাষা, জ্ঞান ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের অংশগুলো সক্রিয় থাকে। নতুন তথ্য গ্রহণ, বিশ্লেষণ এবং তা মনে রাখার ক্ষেত্রেও নিয়মিত পড়ার ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ককে সচল রাখার একটি কার্যকর অনুশীলন হতে পারে বই পড়া। নিয়মিত পড়ার অভ্যাস প্রবীণ বয়সে স্মৃতিশক্তি হ্রাস বা জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যাওয়ার গতি ধীর করতেও সহায়ক হতে পারে।

কমতে পারে আলঝেইমারসের ঝুঁকি
কিছু বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় নিয়মিত বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বই পড়ার সঙ্গে প্রবীণ বয়সে আলঝেইমারসের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিছু গবেষণায় এই ঝুঁকি প্রায় ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, সপ্তাহে অন্তত একবার বই পড়ার মতো অভ্যাসও দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

ছয় মিনিটেই কমতে পারে মানসিক চাপ
বই পড়ার আরেকটি বড় সুবিধা হলো মানসিক চাপ কমাতে এর সম্ভাব্য ভূমিকা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ছয় মিনিট মনোযোগ দিয়ে বই পড়ার পর হৃদস্পন্দন ও পেশির টান কমে আসার মতো শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়। এতে মানসিক চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

গবেষকদের মতে, মনোযোগ দিয়ে বই পড়া মস্তিষ্ককে দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে রাখতে পারে। ফলে শরীর ও মন তুলনামূলকভাবে শান্ত হওয়ার সুযোগ পায়।

একাকিত্ব কমাতে পারে বই পড়া
বর্তমান সময়ে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বই অনেকের জন্য মানসিক সঙ্গী হিসেবে কাজ করতে পারে।

একটি সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৯ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, বই পড়ার সময় তারা অন্য মানুষের সঙ্গে এক ধরনের গভীর মানসিক সংযোগ অনুভব করেন। আর ৫৬ শতাংশ বলেছেন, বইয়ের জগতে ডুবে গেলে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি কমে যায়।

শুধু একা পড়াই নয়, পাঠচক্র বা বুক ক্লাবেও অংশ নেওয়া যায়। এর মাধ্যমে বই পড়ার পাশাপাশি নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।

বাড়তে পারে সহমর্মিতা
গল্প ও উপন্যাস পড়ার সময় পাঠক যখন কোনো চরিত্রের আবেগ, সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন, তখন অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণে কথাসাহিত্য পড়ার সঙ্গে সহমর্মিতা বৃদ্ধির সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, নিয়মিত গল্প বা উপন্যাস পড়লে ভিন্ন মত ও অভিজ্ঞতার মানুষের প্রতি বোঝাপড়া এবং সহনশীলতা বাড়তে পারে।

ইতিবাচক পরিবর্তনে অনুপ্রেরণা
প্রায় চার হাজার পাঠকের ওপর পরিচালিত একটি সামাজিক জরিপে নিয়মিত বই পড়ার সঙ্গে বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বইয়ের বিভিন্ন চরিত্রের পরিবর্তন, সংগ্রাম ও সাফল্য পাঠকদের নিজেদের জীবন নিয়েও নতুন করে ভাবতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। এর প্রভাবে কেউ নতুন চাকরি খোঁজা, ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা, নতুন দক্ষতা শেখা কিংবা স্বাস্থ্যের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়ার মতো পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন।

কাগজের বই পড়ার আলাদা সুবিধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক নোটিফিকেশন দেখা বা দ্রুত স্ক্রল করার অভ্যাসের সঙ্গে বই পড়ার অভিজ্ঞতার পার্থক্য রয়েছে। কাগজের বই পড়ার সময় সাধারণত মনোযোগ একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা লেখার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্ভব হয়।

এতে চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও গভীর মনোযোগের চর্চা হয়। পাশাপাশি ঘুমের আগে মোবাইল বা অন্য ডিজিটাল পর্দার পরিবর্তে বই পড়া অনেকের জন্য একটি শান্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

প্রতিদিন অল্প সময় হলেও বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্ক সচল রাখা, মানসিক চাপ সামলানো, একাকিত্ব কমানো এবং সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তাই ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন কিছুটা সময় বইয়ের জন্য রাখা হতে পারে নিজের যত্ন নেওয়ার একটি সহজ উপায়।

বিভি/টিটি

মন্তব্য করুন: