ধানের শীষেই মুক্তি, জনগণের ভাগ্য ফেরানোর একমাত্র পথ: প্রিন্স
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনী জনসমাবেশে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, এই নির্বাচন রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়া, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের নির্বাচন।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) হালুয়াঘাট পৌর শহরের হালুয়াঘাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের এই বিশাল সমাবেশে তিনি বলেন, ধানের শীষই মুক্তি, গণতন্ত্র ও জনগণের ভাগ্য ফেরানোর একমাত্র পথ। তিনি সবাইকে ধানের শীষ প্রতীকে আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কৃষক কাঁদছে, যুবক বেকার, গারো পাহাড়ের পাদদেশের জনপদগুলো আজও অনুন্নত—এই অবহেলার জবাব দেবে ধানের শীষ।
প্রিন্স বলেন, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া আজ অবহেলার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে বন্যায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়, সীমান্ত অরক্ষিত থাকে, কৃষক ন্যায্য মূল্য পায় না, আর তরুণ সমাজ বেকার হয়ে ভবিষ্যৎ হারাচ্ছে। দারিদ্র্য মানুষকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
তিনি বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পাহাড়ি ঢল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর কৃষকের স্বপ্ন পানিতে ডুবে যায়। সবাই প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে। তার ভাষায়, “ধানের শীষে ভোট মানে কৃষকের কান্নার জবাব।”
তিনি আরও বলেন, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। রাস্তা-ঘাট, কৃষি, সীমান্ত নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই বৈষম্য করা হয়েছে। জনগণের ভোটে ধানের শীষ বিজয়ী হলে হালুয়াঘাটকে একটি বৈষম্যমুক্ত, পরিকল্পিত ও উন্নত জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
প্রিন্স বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফার আলোকে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ ও বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।

তিনি জানান, নির্বাচিত হলে পরিবারভিত্তিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে মা ও গৃহিণীদের নামে বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান করে উৎপাদনে সহায়তা করা হবে। এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষিত বেকারদের জন্য এক বছরের ‘বেকার ভাতা’ চালু, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ায় কলকারখানা স্থাপন করে বেকারত্ব নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, চোরাচালান ও মাদকমুক্ত একটি কর্মমুখর ও শান্তিপূর্ণ জনপদ গড়ে তোলা হবে। বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা ও দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান করা হবে। সরকারি হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত করা, নতুন অ্যাম্বুলেন্স প্রদান এবং প্রতিটি ইউনিয়নের দুর্গম এলাকায় বেসরকারি মিনি হাসপাতাল স্থাপন করা হবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে সরকারি ধান ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সব ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা হবে।
তিনি বলেন, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিব, মন্দিরের পুরোহিত এবং গির্জার ফাদারদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মানী ও উৎসব ভাতা প্রদান করা হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মাদ্রাসাসহ ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
হালুয়াঘাট পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করা, জলাবদ্ধতা নিরসন ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, পৌর পার্ক, শিশু পার্ক, শিল্পকলা ও শিশু একাডেমি, পাবলিক লাইব্রেরি ও বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন এবং ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন চালুর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির সংকট নিরসন, পাঁচ বছরের মধ্যে ৮০ শতাংশ রাস্তা পাকাকরণ ও সেতু নির্মাণ, ময়মনসিংহ থেকে হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া হয়ে পূর্বধলা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপন, খাদ্যগুদাম ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের কথাও জানান তিনি।
ছাত্রছাত্রীদের মানসম্মত শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, হালুয়াঘাটে স্টেডিয়াম নির্মাণ ও নিয়মিত ক্রীড়া আয়োজন, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা সংরক্ষণে পৃথক জাদুঘর স্থাপন এবং সড়ক ও স্থাপনার নামকরণ করা হবে বলে জানান প্রিন্স।
তিনি আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, হালুয়াঘাটের গোবরাকুড়া ও করইতলী স্থলবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু, বছরব্যাপী আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ও ইমিগ্রেশন চালু করা হবে। শ্রমিক ও গারো অধ্যুষিত এলাকায় হাসপাতাল স্থাপন, নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, নারীদের জন্য কুটির ও তাঁতশিল্প উন্নয়ন, নারী নিরাপত্তা ও নির্যাতন রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমি সচল ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হবে।
প্রিন্স অভিযোগ করে বলেন, অতীতে সীমান্ত এলাকা হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়াকে অবহেলিত রেখে উন্নয়নের নামে লুটপাট চালানো হয়েছে। কৃষক ন্যায্য দাম পায়নি, তরুণরা বেকার থেকেছে, আর সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশেহারা। বিএনপি ক্ষমতায় এলে মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হবে প্রথম কাজ।
তিনি বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য জনগণের রায় চাইছে। এই নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয় মানেই জনগণের বিজয়, গণতন্ত্রের বিজয়।
সমাবেশ শেষে ধানের শীষের পক্ষে এক বিশাল গণমিছিল বের করা হয়। মিছিলটি হালুয়াঘাট পৌর শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়। এতে অংশ নেওয়া হাজারো মানুষের স্লোগানে পুরো পৌর শহর মুখরিত হয়ে ওঠে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক এনামুল্লাহ কালাম, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম মিয়া বাবুল, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক হানিফ মোহাম্মদ শাকের উল্লাহসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বিভি/পিএইচ



মন্তব্য করুন: